শিশুর স্বাস্থ্য ও বৃদ্ধির জন্য পুষ্টি – Nutrition For Health & Growth

শিশুর স্বাস্থ্য ও বৃদ্ধির জন্য পুষ্টি - Nutrition For Health & Growth
শিশুর স্বাস্থ্য ও বৃদ্ধির জন্য পুষ্টি - Nutrition For Health & Growth

স্বাস্থ্য ও বৃদ্ধির জন্য পুষ্টি – Nutrition For Health & Growth

স্বাস্থ্য ও বৃদ্ধির জন্য পুষ্টি – Nutrition For Health & Growth- বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশগুলির মতো আমাদের ভারতবর্ষেও অপুষ্টিতে আক্রান্তের সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। জাতীয় সমীক্ষাতে দেখা গেছে আমাদের দেশে 5 বছরের কমবয়সি শিশুদের ক্ষেত্রে অপুষ্টিতে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় 66%, অপর পক্ষে পাকিস্তানে এর মান 40% এবং চিনে মাত্র 16%। ভারতবর্ষে এই উচ্চহারের অপুষ্টিতে আক্রান্ত হওয়ার প্রধান কারণগুলি হল-

  • অর্থনৈতিকভাবে নিম্নমানের অবস্থা।
  • জনসংখ্যার উচ্চহারে বৃদ্ধি।
  • পুষ্টিশিক্ষা সম্পর্কে অজ্ঞতা।
  • খাদ্যবস্তুর পুষ্টিমূল্য সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব।
  • নির্দিষ্ট অভাবজনিত অবস্থাভেদে খাদ্য নির্বাচন।

স্বাস্থ্য ও বৃদ্ধির জন্য পুষ্টি

পরীক্ষামূলক খাদ্য ব্যবস্থার জন্য সরকার দেশের গর্ভবর্তী, প্রসূতি ও শিশুদের নির্বাচন করেছেন কারণ আমাদের মতো নিম্ন অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পন্ন দেশে শিশু মৃত্যুর হার সর্বাপেক্ষা বেশি। এই শিশু মৃত্যুর হারের সঙ্গে শিশুর অপুষ্টি, গর্ভবতী ও দুগ্ধপ্রদানশীল মায়ের অপুষ্টি নিশ্চিতভাবে সম্পর্কযুক্ত। সরকার পরিচালিত এই পুষ্টি প্রকল্পের সফলতা লক্ষ করে জনসাধারণ নিজেদের পুষ্টিমান উন্নত করার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

জাতীয় পুষ্টি প্রকল্পগুলি রূপায়ণে সরকার পরিপূরক (supplementary) খাদ্যের পুষ্টিমানের উপর যেভাবে গুরুত্ব আরোপ করেছেন সেইরূপ ওই খাদ্যের অর্থনৈতিক মূল্যের দিকটাও বিচার করেছেন যাতে সমাজের প্রতিটি সদস্য এই পরিপূরক খাদ্য গ্রহণ করতে পারে। কম খরচে যথাযথ মানের খাদ্য সরবরাহ করার উদ্দেশ্যে সরকার এই জাতীয় পুষ্টি প্রকল্পে সবসময় রুচির উপর প্রাধান্য দিয়ে স্থানীয় খাদ্যের উপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করেছেন। এজন্য রাজ্যভেদে পরিপূরক খাদ্য প্রকল্পগুলিতে বিভিন্ন প্রকার খাদ্যসামগ্রী অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

শিশুর স্বাস্থ্য ও বৃদ্ধির জন্য পুষ্টি – Nutrition For Health & Growth

শিশুর স্বাস্থ্য ও বৃদ্ধির জন্য পুষ্টি - Nutrition For Health & Growth

আমাদের দেশে পুষ্টি প্রকল্পগুলি পরিচালনার জন্য বিভিন্ন সরকারি বিভাগ ও বেসরকারি সংস্থা যুক্ত আছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-

1. সমাজ কল্যাণ বিভাগ (Department of Social Welfare)

2. শিশুকল্যাণ ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ (Department of Child Welfare & Family Planning)

3. উপজাতি কল্যাণ বিভাগ (Department of Tribal Welfare)

4. কমিউনিটি উন্নয়ন বিভাগ (Department of Community Development)

5. লায়নস ক্লাব (Lions Club)

6. ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ চাইল্ড ওয়েলফেয়ার (Indian Council of Child Welfare)

7. কেন্দ্রীয় সমাজকল্যাণ বোর্ড (Central Social Welfare Board)

8. হরিজন সেবক সংঘ (Harijan Sevak Sangha)

স্বাস্থ্য ও বৃদ্ধির জন্য পুষ্টি জাতীয় পুষ্টি প্রকল্প সমূহের উদ্দেশ্য:

জাতীয় স্তরে পুষ্টিমান উন্নয়নের জন্য কর্মসূচীগুলিকে একত্রে প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি বা পুষ্টি উপাদানের অভাব নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি বলে। জাতীয় পুষ্টি প্রকল্পসমূহের উদ্দেশ্য হল-

1. খাদ্যের পুষ্টি মূল্য সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা।

2. স্বাস্থ্য বজায় রাখার উপায় এবং স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য কোন কোন খাদ্য কী পরিমাণে গ্রহণ করা উচিত সেসব বিষয়ে জনসাধারণকে সচেতন করা।

3. শিশুদের অপুষ্টিজনিত বিভিন্ন রোগ দূরীভূত করণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

4. শিশু মৃত্যুর হার কমিয়ে আনা।

5. শিশুর স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য মায়েদের শিশুর পুষ্টি সম্পর্কে শিক্ষাদান করা এবং শিশুর স্বাস্থ্য সম্পর্কে পরিবেশের ভূমিকা আলোচনা করা।

6. অর্থনৈতিক অবস্থা, স্থানীয় উৎপন্ন খাদ্যবস্তু, রুচিভেদ, পুষ্টিমান ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন খাদ্যশ্রেণী থেকে খাদ্যবস্তুনির্বাচন করার কৌশল সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা।

7. ছয় বছর বয়সের নীচের শিশুদের স্বাস্থ্যের পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবংপ্রতিটি প্রকল্পের সঙ্গে পরীক্ষামূলক ব্যবস্থা যুক্ত করা।

8. বয়সভেদে শারীরিক অবস্থাভেদে এবং রোগগ্রস্থ ব্যক্তিদের খাদ্যতালিকা প্রস্তুত করা এবং ওই খাদ্যতালিকা থেকে খাদ্যগ্রহণের মাধ্যমে জনসাধারণ কীভাবে উপকৃত হচ্ছে তা পরীক্ষামূলক ভাবে জনসাধারণকে অবগত করা।

9. দেশের উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য, জনগণের দৈহিক ও মানসিক স্বাস্থ্য বিকাশলাভের জন্য স্বাস্থ্য ও পুষ্টির ভূমিকা সম্পর্কে জনসাধারণকে সচেতন করা।

স্বাস্থ্য ও বৃদ্ধির জন্য পুষ্টি জাতীয় পুষ্টি প্রকল্পের অধীনে বিভিন্ন করণীয় কাজগুলি হল-

1. গর্ভবর্তী, দুগ্ধপ্রদানকারী মায়েদের পুষ্টি ও স্বাস্থ্য বিষয়ে শিক্ষাদানের মাধ্যমে সচেতন করে তোলা।

2. বিদ্যালয়গামী বালক-বালিকাদের পুষ্টি ও স্বাস্থ্য শিক্ষা বিষয়ে সচেতন করানো।

3. পরিপূরক খাদ্য প্রদানের মাধ্যমে জনসমাজে নিম্নমাত্রায় অপুষ্টিজনিত রোগগুলির প্রতিকার করা।

4. জনসমাজের পুষ্টিমাত্রা উন্নয়নের জন্য মুরগী পালন, দুধ সংগ্রহের জন্য গাভি পালন, সবজি পাওয়া জন্য বাগান তৈরি করা ইত্যাদিতে আর্থিক সাহায্য প্রদান করা।

5. জাতীয় পুষ্টি প্রকল্পের অধীনে করণীয় কাজগুলি হল-

6. প্রাকৃবিদ্যালয়গামী ও বিদ্যালয়গামী ছাত্রছাত্রীদের দৈহিক বৃদ্ধি ও পুষ্টিগত মান উন্নয়নের জন্য পরিপূরক খাদ্য প্রদান করা।

7. বিদ্যালয়গামী ছাত্রছাত্রীদের পুষ্টি ও স্বাস্থ্যশিক্ষা প্রদান করা।

8. গর্ভবর্তী ও দুগ্ধদানকারী মায়েদের দ্বারা অপুষ্টিজনিত রোগের চিকিৎসা করা।

9. যথাযথ পুষ্টিদ্রব্য প্রদানের দ্বারা অপুষ্টিজনিত রোগের চিকিৎসা।

10. যথাযথ মাত্রায় ও কম পয়সায় উচ্চ পুষ্টিমানের খাদ্যদ্রব্য সংগ্রহের জন্য রান্নাঘরের কাছাকাছি অঞ্চলে ছোটো বাগান তৈরি করা, গাভি পালন ও মুরগি পালনের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সাহায্য প্রদান করা।

স্বাস্থ্য ও বৃদ্ধির জন্য পুষ্টি ভারতের জাতীয় পুষ্টি প্রকল্পসমূহঃ-

জাতীয় ও রাজ্য স্তরে বিভিন্ন পুষ্টি প্রকল্পগুলি দেশের জনসাধারণের পুষ্টির মান উন্নয়নের জন্য সচেষ্ট। এই প্রকল্পগুলি পরিচালনার জন্য আর্থিক দায়ভার জাতীয় ও রাজ্য সরকার উভয়েই বহন করে। জাতীয় সরকারের অর্থমন্ত্রক এবং যোজনা কমিশন এই প্রকল্পগুলি পরিচালনার জন্য অর্থ বরাদ্দ করেন। কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রক নির্দিষ্ট প্রকল্প পরিচালনা ও মূল্যায়নের দায়িত্বে থাকে। উল্লেখযোগ্য প্রকল্পগুলি হল নিম্নরূপঃ

মধ্যাহ্নকালীন আহার প্রকল্প:

ভারত সরকারের শিক্ষাবিভাগ বর্তমানে যা মানবসম্পদ উন্নয়ন বিভাগ নামে পরিচিত, 1961 খ্রীষ্টাব্দে এই পুষ্টি প্রকল্প শুরু করেন। পূর্বে এই প্রকল্পটিকে অ্যাডভান্স নিউট্রিশনাল প্রোগ্রাম বা স্কুল লাঞ্চ প্রোগ্রাম নামে অভিহিত করা হত।

উদ্দেশ্য: এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যগুলি হল-

1. বিদ্যালয়গামী শিশুসহ প্রাকবিদ্যালয় শিশুদের অপুষ্টি দূর করা।

2. বিদ্যালয়ে শিশুদের নিয়মিত উপস্থিতির হার বৃদ্ধি করানো।

শিশুদের বিদ্যালয় ছাড়ার প্রবণতা হ্রাস করা। এই প্রকল্পে খাদ্যপ্রদানের মাধ্যমে শিশুর দৈনিক শক্তি চাহিদার 1/3 অংশ এবং দৈনিক প্রোটিন চাহিদার 1/2 অংশ সরবরাহ করার ব্যবস্থা করা। ‘CARE’ প্রদত্ত খাদ্যদ্রব্যের সাহায্যে এই প্রকল্প শুরু হয়েছিল যদিও বর্তমানে রাজ্য সরকার এই প্রকল্পের আর্থিক অনুদান প্রেরণ করেন। ভারতবর্ষের তামিলনাড়ুতে এই প্রকল্পটি খুবই ভালোভাবে চলছে। বর্তমানে বিভিন্ন স্কুলে রান্না করা খাবার অথবা শুধু খাদ্যসামগ্রী সরবরাহ করা হচ্ছে। ‘সর্বশিক্ষা অভিযান’ প্রকল্প শুরু হওয়াতে MDMP- এর কাজ আরও তরান্বিত হয়েছে। উপভোক্তাঃ

(i) বিদ্যালয়গামী 6-11 বছরের ছাত্রছাত্রী মধ্যাহ্নকালীন আহার প্রদান।

(ii) বর্তমানে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত বিদ্যালয়গামী ছাত্র-ছাত্রীদের পুষ্টি প্রদান।

কাজকর্ম: এই প্রকল্পের প্রধান কাজ হল

(i) বিদ্যালয়গামী শিশুদের পরিপূরক খাদ্য প্রদান।

(ii) সাধারণত রান্না করা খাবার দেওয়া হয়।

(iii) এই প্রকল্পে খাদ্য প্রদানের মাধ্যমে শিশুর দৈনিক শক্তি চাহিদার 3 অংশ (450-500 Kcal) এবং দৈনিক প্রোটিন চাহিদার 2 অংশ (20-30 gm) সরবরাহ করা হয়।

(iv) বছরে সাধারণত 200 দিন এই খাবার দেওয়া হয়।

(v) বিদ্যালয়গামী ছাত্রছাত্রীদের স্বাস্থ্যের উন্নতি সাধন করা।

(vi) স্কুল-ছুট (Drop-out) ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা কমিয়ে এনে শিক্ষার প্রসার ঘটানো।

মধ্যাহ্নকালীন আহার তৈরীর মূলনীতি: মধ্যাহ্নকালীন আহার তৈরীর ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত নীতিগুলি মেনে চলা উচিত-

a. আহারটি হবে বাড়ির খাবারের পরিপূরক, কোন সময়েই তা বাড়ির খাবারের বিকল্প হবে না।

b. আহারটি শিশুর প্রাত্যহিক ক্যালোরি চাহিদার অংশ ও প্রোটিন চাহিদার অংশ পূরণে সমর্থ হবে।

c. আহারটির খরচ যথাসম্ভব কম হবে।

d. আহারটি এমন হবে যা সহজেই বিদ্যালয়ে তৈরী করা সম্ভব।

e. আহারটি তৈরীর জন্য স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত সহজলভ্য খাদ্য ব্যবহার করতে হবে।

f. এক ঘেয়েমি দূর করার জন্য মাঝে মাঝেই মেনু পরিবর্তন করতে হবে।

স্বাস্থ্য ও বৃদ্ধির জন্য পুষ্টি জাতীয় পুষ্টি প্রকল্পের অধীনে করণীয় কাজগুলি হল-

প্রাক্‌বিদ্যালয়গামী ও বিদ্যালয়গামী ছাত্রছাত্রীদের দৈহিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসক ও অন্যান্য কর্মীরা পুষ্টিশিক্ষাদানে যুক্ত থাকেন। জনসাধারণের অংশগ্রহণে উৎসাহ প্রদানঃ প্রয়োগমূলক পুষ্টি প্রকল্পের সার্থক রূপায়নের ক্ষেত্রে জনসাধারণের সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরী। সেই কারণে বিভিন্ন মহিলা সংগঠন, বালওয়াড়ী, যুবসংঘ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানকে এবং পাশাপাশি এলাকার পরিচিত ব্যক্তি, স্কুলশিক্ষক প্রভৃতি মানুষকে এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হতে উৎসাহিত করা হয়।

UNICEF (United Nations International Children’s Educational Fund):

সম্মিলিত রাষ্ট্রসংঘের অন্তর্গত একটি বিশেষ সংস্থা (Specialised agency)। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে বিধ্বস্ত দেশগুলির শিশুদের পুনর্বাসনের জন্য রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সভা (General Assembly) একটি অর্থভাণ্ডার তৈরি করে এবং তার নাম দেওয়া হয় United Nations International Children’s Emergency Fund সংক্ষেপে UNICEF।

সংকট কেটে যাবার পরে ১৯৫৩ সালে ওই অর্থভাণ্ডারটি নতুন নামকরণ করা হয় United Nations Children’s Fund কিন্তু সংস্থাটির আদি অক্ষর দিয়ে তৈরি পুরানো সংক্ষিপ্ত নাম UNICEF বজায় রাখা হয়। WHO, FAO, UNICEF প্রভৃতি রাষ্ট্রসংঘের অন্যান্য শাখার সংঘে এটি যৌথ উদ্যমে কাজ করে চলেছে।

পোল্ট্রি, কৃষিকাজ, মাছচাষ, গো-পালন প্রভৃতি বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যাপারে UNICEF প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলিকে সহায়তা করে। যানবাহন, সাজসরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি প্রভৃতি ক্ষেত্রেও UNICEF এর সহায়তা পাওয়া যায়। এই পত্রপত্রিকা শিক্ষাসামগ্রীও UNICEF এর সহায়তায় সরবরাহ হয়।

এছাড়াও যারা প্রশিক্ষণ নেন তাদের stipend UNICEF দিয়ে থাকে। সমাজের পুষ্টির উন্নতির জন্য UNICEF একটি কর্মসূচি গ্রহণ করে এবং একে GOBI বলে। G = Growth Chart- শিশুবিকাশ লেখচিত্রের দ্বারা শিশুর পুষ্টির মান নির্ধারণ। O = Oral rehydration- উদরাময় নিবারণের জন্য Oral rehydration থেরাপির প্রয়োগ। B = Breast feeding -মাতৃস্তন্য দানে জননীকে উৎসাহিত করা। I = Immunization -অনাক্রম্যতার সৃষ্টির জন্য বিশ্বের প্রতিটি শিশুর টিকাকরণ পদ্ধতি।

FAO (Food And Agricultural Organisation):

Food and Agricultural Organization (FAO) সম্মিলিত রাষ্ট্রসংঘের অন্তর্গত একটি স্বাধীন স্বশাসিত সংস্থা। 1945 সালে গঠিত হয়, সদর দপ্তর রোম নগরীতে অবস্থিত। FAO এর মন্ত্র (motto) হল FIAT PANIS (Let there be bread) বসুন্ধরা হোক অন্নপ্রসবা। FAO এর প্রধান চিন্তা হল বিশ্বের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার প্রয়োজনের সঙ্গে তাল রেখে উৎপাদন বাড়ানো এবং খাদ্য যাদের বিশেষ প্রয়োজন তাদের জন্য যথেষ্ট পরিমাণে এবং প্রয়োজনের অনুপাতে খাদ্যের ব্যবস্থা করা।

1960 সালে এই সংস্থাটি ক্ষুধা থেকে মুক্তি আন্দোলন FFH- (Freedom from hunger) শুরু করে। এই আন্দোলনের উদ্দেশ্যে দুটি– খাদ্য ও অপুষ্টির সমস্যা –যে সমস্যাতে বিশ্বের অর্ধেকের বেশি মানুষ জর্জরিত– সেই সমস্যা সম্বন্ধে বিশ্বচেতনা জাগ্রত করা এবং (2) জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে এই সমস্যা সমাধানের জন্য অনুকূল জনমত গঠন করা। এই ব্যাপের তিনটি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে –

(1) সংবাদসংগ্রহ ও শিক্ষা

(2) গবেষণা এবং

(3) সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ। FAO এই প্রকল্পের সমস্ত ব্যাপারে কারিগরী সহায়তা দিয়ে থাকে ।

FAO এর প্রধান কাজগুলি হল- সমস্ত দেশে পুষ্টির মান উন্নত করা। কৃষি, মৎস্যচাষ ও বন সংরক্ষণ ক্ষেত্রে দক্ষতা বাড়ানো। জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সাহায্য করা।

গ্রামাঞ্চলের কৃষিজ পথ্যের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা।

WHO (World Health Organisation):

সম্মিলিত রাষ্ট্রসংঘের এটি একটি বিশেষ (specialised) অ-রাজনৈতিক সংস্থা। সদর দপ্তর জেনেভাতে অবস্থিত। 1948 সালের ৭ ই এপ্রিল এর প্রতিষ্ঠা। প্রতি বছর এই দিনটি বিশ্বস্বাস্থ্য দিবসরূপে (World Health Day) উদযাপিত হয় এবং ওই দিনে একটি বিশ্বস্বাস্থ্য দিবস বিষয় (World Health Day theme) নির্বাচন করা হয়।

উদ্দেশ্যঃ বিশ্বের প্রতিটি মানুষকে স্বাস্থ্যের সর্বোত্তম মাত্রালাভের অধিকারী করা “attaimnent by all of the highest level of health”। WHO- র পরবর্তী লক্ষ্য ছিল “Water for all by 1990” এবং “Health for all by 2000 AD” ।

এসব ঘোষণার উদ্দেশ্য হল সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে প্রতিটি মানুষকে উৎপাদনক্ষম করে তোলা। 1990 সালের মধ্যে সমস্ত শিশুর টিকাকরণ প্রকল্পটি অগ্রাধিকার লাভ করেছে। WHO প্রকল্পের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়ে সমস্ত রকম সহযোগিতা করে এছাড়া শিশুদের খাওয়ানোর ব্যপারে অভিজ্ঞ একজন শিশুবিশেষজ্ঞ WHO সরবরাহ করে, তিনি শিশুদেরও যত্ন নেন। জনপুষ্টি উন্নয়নে এই সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলি হল-

1. অপুষ্টি প্রতিরোধ কর্মসূচি গ্রহণ করা।

2. পুষ্টিশিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।

3. জনপুষ্টির মান নির্ণয় করা।

4. জননী ও শিশুর স্বাস্থ্য, প্রজনন স্বাস্থ্যশিক্ষা বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরী করা।

বালওয়াড়ি পুষ্টি প্রকল্প (Balwadi Nutrition Programme: BWP):

জাতীয় সরকারের সমাজকল্যাণ বিভাগ (Social Welfare Department) 1970-71 খ্রীষ্টাব্দে এই প্রকল্পটি প্রবর্তন করে। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত করার জন্য জাতীয় শিশুকল্যাণ সংসদ সহ জাতীয় স্তরের আরও চারটি সংগঠন এই প্রকল্পে অর্থ প্রদান করেন। আর্থিক দিক দিয়ে অনগ্রসর অঞ্চলে 5-6 বছরের শিশুদের জন্য বালওয়াড়ি প্রতিষ্ঠা করা হয়। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমে এই প্রকল্পটি রূপায়িত করা হয় কারণ এই সংস্থাগুলি আর্থিক অনুদান পেয়ে থাকে।

উদ্দেশ্যঃ এই প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্যগুলি হল-

গ্রামাঞ্চলের শিশুদের (3-6 বছর) পুষ্টিগত মান উন্নয়ন।

শিশুদের জন্য প্রথাবর্হিভূত শিক্ষাদানের ব্যবস্থা।

উপভোক্তা:

গ্রামাঞ্চলের 3-6 বছর বয়সের শিশুরা এই প্রকল্পের উপভোক্তা।

কাজকর্ম-

এই প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য কাজগুলি হল-

a. পরিপূরক খাদ্য: পরিপূরক খাদ্য প্রতিটি শিশুকে 300 কিলোক্যালোরি ও 10-12 গ্রাম প্রোটিন যুক্ত খাদ্য সরবরাহ করা হয়। বছরে 280 দিন এই খাবার দেওয়া হয়।

b. প্রথাবর্হিভূত শিক্ষা-প্রথা বর্হিভূত শিক্ষার মাধ্যমে শিশুদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশে সহায়তা করা হয়।

রূপায়ন:

এই প্রকল্পটি রাস্তবায়িত করার জন্য জাতীয় শিশুকল্যান সংসদসহ জাতীয়স্তরের আরও চারটি সংগঠন এই প্রকল্পে অর্থপ্রদান করেন। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমে এই প্রকল্পটি রূপায়িত করা হয়।

সুসংহত শিশুবিকাশ প্রকল্প (Integrated Child Development Services: ICDS):

1975 সালের 2 রা অক্টোবর ভারত সরকারের সমাজ কল্যাণ দপ্তর সুসংহত শিশুবিকাশ প্রকল্প চালু করে। এই প্রকল্পটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, এখানে মা ও শিশুকে একটি জৈব একক (Biological unit) হিসাবে গণ্য করা হয় এবং মা ও শিশুর স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সহ সর্বাঙ্গীন উন্নতিসাধনে স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও শিক্ষা সংক্রান্ত পরিষেবা প্রদান করা।

উদ্দেশ্যঃ

1. এই প্রকল্পের মুখ্য উদ্দেশ্যগুলি হল-

2. 0-6 বছর বয়সের শিশুদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টিগত মান উন্নয়ন করা।

3. প্রাকৃবিদ্যালয়গামী শিশুদের মনস্তাত্বিক ও সামাজিক বিকাশের যথাযথ ব্যবস্থা করা।

4. পরিপুরক খাদ্য প্রদানের মাধ্যমে গর্ভবতী ও স্তনদাত্রী মহিলাদের পুষ্টিগত মান উন্নয়ন করা।

5. শিশুদের উপযুক্ত যত্ন নেওয়ার জন্য স্বাস্থ্য ও পুষ্টিশিক্ষার মাধ্যমে মায়েদের সামর্থ বৃদ্ধি করা।

6. শিশুদের সামগ্রিক বিকাশের জন্য বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় সাধন ও বিভিন্ন পরিকল্পনার সার্থক রূপায়নের ব্যবস্থা করা।

উপভোক্তা:

0-6 বছর বয়সের শিশু।

গর্ভবতী স্তনদাত্রী মহিলা।

15-45 বছরের মধ্যে অন্যান্য মহিলা।

কিশোরী (কিছু নির্ধারিত এলাকায়)।

কাজকর্মঃ

1. এই প্রকল্পের মাধ্যমে উপভোক্তাদের নিম্নলিখিত পরিষেবাগুলি প্রদান করা হয়-

2. পরিপুরক পুষ্টি 6 বছর বয়স পর্যন্ত শিশু এবং গর্ভবতী ও স্তনদাত্রী মহিলাদের জন্য।

3. স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রাথমিক চিকিৎসা, বা পরামর্শগত চিকিৎসা পরিষেবা 6 বছর বয়স পর্যন্ত শিশু এবং গর্ভবতী ও স্তনদাত্রী মহিলাদের জন্য।

4. প্রতিষেধক টিকাপ্রদান 6 বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের জন্য।

5. বৃদ্ধির পরিমাণ 6 বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের জন্য।

6. প্রথাবর্হিভূত প্রাক প্রাথমিক শিক্ষা- 3-6 বছর বয়সের শিশুদের জন্য।

7. স্বাস্থ্য ও পুষ্টিশিক্ষা- গর্ভবতী, স্তনদাত্রী ও 15-45 বছরের অন্যান্য মহিলাদের জন্য।

রূপায়নঃ

কেন্দ্রীয় সরকারের মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের অধীন স্ত্রী ও শিশু কল্যাণ বিভাগের মাধ্যমে এই প্রকল্পটি পরিচালিত হয়। স্বাস্থ্য বিভাগ, সমষ্টি উন্নয়ন দপ্তর ও খাদ্য মন্ত্রক এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হতে সর্বতোভাবে সাহায্য করে। আন্তর্জাতিক সংস্থা UNICEF এই প্রকল্পটি রূপায়নে সাহায্য করে। অঙ্গনওয়াড়ী কেন্দ্রের মাধ্যমে অঙ্গনওয়াড়ী কর্মী ও স্বাস্থ্যকর্মীর দ্বারা সমস্ত পরিষেবাগুলি প্রদান করা হয়ে থাকে।

সুসংহত শিশুবিকাশ প্রকল্পে পরিপূরক পুষ্টি:

সুসংহত শিশুবিকাশ প্রকল্পের অধীনে পরিপূরক পুষ্টি পরিষেবার মাধ্যমে উপভোক্তাদের প্রধানত দুধরণের খাদ্যপ্রদান করা হয়-

1. কাঁচা খাবার অর্থাৎ রান্না না করা খাবার- যা উপভোক্তারা বাড়ীর নিয়ে গিয়ে রান্না করে খায় (Take home food)।

2. রান্নাকরা খাবার যা উপভোক্তারা কেন্দ্রে বসেই গ্রহণ করে (cooked food on the spot feeding)। উভয় প্রকার খাদ্য প্রদানেরই কিছু সুবিধা ও অসুবিধা আছে। তবে প্রাথমিকভাবে কেন্দ্রে বসে রান্না করা খাবার গ্রহণকেই গুরুত্ব দেওয়া হয় বেশী।

সুসংহত শিশুবিকাশ প্রকল্পের পরিপুরক পুষ্টি পরিষেবার মূল্যায়ণ

1. কেন্দ্রীয় সরকার ও বিশ্বব্যঙ্ক সহ বিভিন্ন সংঙ্গ বিভিন্ন সময়ে সমীক্ষা চালিয়ে সুসংহত শিশুবিকাশ প্রকল্পের পরিপূরক পুষ্টি পরিষেবার মূল্যায়নের চেষ্টা করেছেন। তাদের সমীক্ষা থেকে নিম্নলিখিত বিষয়গুলি জানা যায়-

2. এই পরিষেবার যতেষ্ট চাহিদা থাকলেও পরিষেবা প্রদানের ক্ষেত্রে পরিষেবার গুণগত মানের ক্ষেত্রে এবং যথাযথ সমন্বয়ের ক্ষেত্রে বেশকিছু সমস্যা দেখা দেয়। এই প্রকল্পের দ্বারা উপভোক্তাদের খাদ্য নিরাপত্তা বৃদ্ধি পেলেও তাদের অপুষ্টি চিহ্নিত করণ ও দূরীকরণের ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যবস্থ নেওয়া হয় নি।

3. 6-36 মাস বয়সের শিশুরা গর্ভবর্তী স্তনদাত্রী মায়েরা সবসময় কেন্দ্রে আসে না, ফলে তারা পরিপুরক পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হয়।

4. পুষ্টিগত অবস্থার কথা বিবেচনা না করে 3-5 বছর বয়সের সমস্ত শিশুই একই পরিমান খাবার পেয়ে থাকে।

5. অঙ্গনওয়াড়ী কেন্দ্রের কর্মীদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে ঘাটতি লক্ষ্য করা যায়।

6. যথাসঙ্গ তত্ত্বাবধান, সমাজের মানুষদের সমর্থন এবং বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব লক্ষ্য করা যায়।

দশম পরিকল্পনায় সুসংহত শিশুবিকাশ প্রকল্প (ICDS During tenth plan- 2002-2007)

প্রাক্‌ বিদ্যালয়গামী শিশু, গর্ভবতী ও স্তনদাত্রী মহিলার মধ্যে অপুষ্টি দূরীকরণকে দশম পরিকল্পনায় বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সুসংহত শিশুবিকাশ প্রকল্পের মাধ্যমে পরিপুরক পুষ্টি পরিষেবার দ্বারা এই অপুষ্টি দূরীকরণকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। দশম পরিকল্পনার সুসংহত শিশুবিকাশ প্রকল্পের নিম্নলিখিত বিষয়গুলির প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়-

1. মহিলাদের পুষ্টি ও স্বাস্থ্যবিষয়ক শিক্ষাকে আরও শক্তিশালী করা।

2. 6 মাস- 3 বছর বয়স্ক শিশু, গর্ভবর্তী ও স্তনদাত্রী মায়েদের কাছে পরিষেবা আরও ভালোভাবে পৌঁছে দেওয়া।

3. অপুষ্টিপ্রবণ জনগণের পুষ্টিমান যাচাই করা।

4. শিশুদের বৃদ্ধি যথাযথ হচ্ছে কিনা তা দেখার জন্য প্রতি তিন মাসে অন্তত একবার সমস্ত শিশুকে screening করা।

5. যথাযথ স্বাস্থ্য ও পুষ্টি পরিষেবার মাধ্যমে গ্রেড III ও গ্রেড IV অপুষ্টিযুক্ত শিশুকে পরিবর্তী তিনমাসের মধ্যে যথাক্রমে গ্রেড II ও গ্রেড III অপুষ্টিতে উন্নতি করা।

6. অতিমাত্রায় অপুষ্টিযুক্ত শিশুদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।

7. প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের উপযুক্ত প্রশিক্ষন ও তত্ত্বাবধানের ব্যবস্থা এবং সমাজের মানুষদের অংশগ্রহণকে উৎসাহ প্রদানের মাধ্যমে এই প্রকল্পের গুণগত মান ও গ্রহণ যোগ্যতা বৃদ্ধি করা।

8. প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন দপ্তরগুলির মধ্যে সমন্বয় আরও বৃদ্ধি করা।

9. সমস্ত স্তরের মানুষের মধ্যে পুষ্টি সচেতনতা বৃদ্ধি করা।

10. প্রকল্পটির উপর যথাযথ নজরদারি ব্যবস্থা করা ও কাজকর্মের মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা।

কাজের বিনিময়ে খাদ্য প্রকল্প (Food for work programme):

কাজের বিনিময়ে খাদ্য প্রকল্পটি হল গ্রামীন কর্মহীন মানুষদের জন্য এক প্রকার কর্মনিশ্চয়তা প্রকল্প।

উদ্দেশ্য-

গ্রামীণ মানুষদের পুষ্টিগত মান উন্নয়ন এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য নয়। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হল গ্রামীণ দরিদ্র জনসাধারণের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় খাবারটুকু সরবরাহ করা। উপভোক্তাঃ গ্রামীণ কর্মহীন দরিদ্র মানুষেরা এই প্রকল্পের উপভোক্তা।

কাজকর্ম-

এই প্রকল্পে বিভিন্ন গঠনমূলক কাজ যেমন রাস্তা তৈরী, পুকুর খনন প্রভৃতি কাজে গ্রামীণ কর্মহীন মানুষদের নিযুক্ত করা হয় এবং কাজের বিনিময়ে তাদের পারিশ্রমিকের পুরোটাই বা একটি অংশ খাবার (চাল, গম প্রভৃতি) হিসাবে প্রদান করা হয়।

মিশ্র পুষ্টি প্রকল্প (Composite Nutrition):

এটি প্রয়োগমূলক পুষ্টি প্রকল্পের একটি বিকল্পরূপ এবং এটি ভারত সরকারের Community Development Department দ্বারা রূপায়িত হয়। দেশের যে সমস্ত অঞ্চলে প্রয়োগমূলক পুষ্টিপ্রকল্প শুরু করা সম্ভবপর ছিল না সেই সমস্ত স্থানে মিশ্র পুষ্টিপ্রকল্প শুরু করা হয়।

উদ্দেশ্য:

1. এই প্রকল্পের উদ্দেশ্যগুলি হল-

2. অপুষ্টির প্রকোপ থেকে জনসাধারণকে রক্ষা করা।

3. জনসাধারণের পুষ্টির মানের উন্নয়ন করা।

4. জনগণের স্বাস্থ্যের উন্নতিসাধন করা।

অপুষ্টিজনিত রক্তাপ্লতা প্রতিরোধক জাতীয় স্তরের কর্মসূচী (National Nutritional Anaemia Prophylaxis Programme: NNAPP):

অপুষ্টিজনিত রক্তাপ্রতা হল আমাদের দেশের জনস্বাস্থ্যগত একটি ভয়াবহ সমস্যা। প্রধানত মহিলারা ও শিশুরা এই রোগে আক্রান্ত হয়। এই রোগ প্রতিরোধ করার জন্য চতুর্থ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সময় (1972) কেন্দ্রীয় সরকার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রনালয়ের অধীনে অপুষ্টিজনিত রক্তাপ্লতা প্রতিরোধক প্রকল্প চালু করেন।

উদ্দেশ্য- এই প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য হল মহিলা ও শিশুদের মধ্যে রক্তাপ্লতার হার যথাসম্ভব কমিয়ে আনা। এই লক্ষ্য পূরণের উদ্দেশ্যে এই প্রকল্পে নিম্নলিখিত বিষয়গুলিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়-

1. নিয়মিত আয়রন সমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণে জনসাধারণকে উৎসাহ প্রদান।

2. ঝুঁকিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে আয়রন ও ফোলিক অ্যাসিডযুক্ত ট্যাবলেট (Folifer) বিতরণ।

3. মারাত্মক রক্তাপ্লতাযুক্ত রোগীদের চিহ্নিত করণ ও তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।

4. উপভোক্তাঃ- এই প্রকল্পের উপভোক্তারা হল-

5. গর্ভবতী ও স্তনদাত্রী মহিলা

6. প্রজননে সক্ষম অন্যান্য মহিলা (Females at reproductive age)

7. 1-5 বছর বয়সের শিশু।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) অনুযায়ী সমীক্ষাতে দেখা যায় আমাদের দেশে অপুষ্টিজনিত রক্তাল্পতাতে আক্রান্তের সংখ্যা হল প্রাকবিদ্যালয়গামী শিশুদের ক্ষেত্রে 76 %, বিদ্যালয়ের ছাত্রদের ক্ষেত্রে 50 %, পুরুষের মধ্যে 15-25 %, নারীদের মধ্যে 75-90 %। অপুষ্টিজনিত রক্তাল্পতার প্রধান কারণ হল দেহে লোহার ঘাটতি। এছাড়াও ফোলিক অ্যাসিড, ভিটামিন B ভিটামিন C ও প্রোটিনের ঘাটতিতে এই রক্তাল্পতা দেখা যায়। এই রক্তল্পতা দূর করার জন্য করণীয় বিষয়গুলি হল-

1. সবুজ সবজি বেশি মাত্রায় গ্রহণ করা।

2. ফেরাস সালফেট ট্যাবলেট গ্রহণ করা।

3. খাদ্যে ফাইটিক অ্যাসিড ও ফসফেটের মাত্রা হ্রাস করা।

4. খাদ্যে অ্যাসকরবিক অ্যাসিডের মাত্রা বৃদ্ধি করা।

5. রক্তাপ্লতার ফলে কলাকোশে অক্সিজেন সরবরাহ হ্রাস পায় এবং এর ফলে কর্মদক্ষতা হ্রাস পায়, নিম্ন ওজন সম্পন্ন শিশুর (Low Birth weight) জন্ম হয়।

6. রক্তাপ্লতায় যে সমস্ত শিশু ও গর্ভবর্তী মায়েরা আক্রান্ত তাদের শনাক্ত করা। এজন্য WHO এর মতানুসারে গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা 10gm% এবং শিশুদের ক্ষেত্রে এর মান 8 gm% এর কম হলে তাদের রক্তাপ্লতা আক্রান্ত হিসাবে গণ্য করে এই প্রতিরোধ কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা।

7. জনসাধারণকে রক্তাপ্লতার কুপ্রভাব ও তা খাদ্যসামগ্রীর দ্বারা কীভাবে দূর করা যায় সে সম্পর্কে অবহিত করা।

8. জননী ও শিশুদের আয়রন ফোলিক অ্যাসিড (IFA) ট্যাবলেট গ্রহণে অনুপ্রাণিত করা।

9. প্রতিকার: যকৃৎ, মাংস, ডিম, মাছ, ডাল, ঢেঁকিছাটা চাল, সবুজ শাকসবজি ইত্যাদি বেশিমাত্রায় খাওয়ালে রক্তাপ্লতা দূরীভূত করা যায়।

অপুষ্টিজনিত অন্ধত্ব প্রতিরোধ জাতীয় কর্মসূচী (National Prophylaxis Programme for the Prevention of Nutritional Blindness: NPPPNB):

আমাদের দেশে যে সমস্ত ভিটামিনের ঘাটতি দেখা যায় তার মধ্যে প্রধান ভিটামিন A এর ঘাটতি। ভিটামিন A এর ঘাটতিতে শিশুদের রাতকানা, কেরাটোম্যালেশিয়া, জেরপথ্যালমিয়া ইত্যাদি চোখের রোগ হয়।

আমাদের দেশে RDA এর তুলনায় 50 % ভিটামিন A শিশুরা পেয়ে থাকে। এই রোগ প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রনালয়ের অধীন 1970 সালে ভিটামিন A- এর অভাবজনিত রোগ প্রতিরোধ প্রকল্প চালু করেন।

উপভোক্তাঃ

1. 6 মাস বয়সের শিশু থেকে 5 বছর বয়স পর্যন্ত সমস্ত শিশু।

2. পুষ্টির অভাবজনিত অন্ধত্ব প্রতিরোধ করার জন্য NPPPNB এর প্রধান দায়িত্বগুলি হল-

3. শিশুদের 9 মাস বয়সে হামের টিকার সঙ্গে 1 লক্ষ ইউনিট বা 1ml ভিটামিন A তেল খাওয়ানো।

4. DPT ও OPD বুস্টারডোজ 16 মাস বয়সে দেওয়ার সময় 2 লক্ষ ইউনিট ভিটামিন A তেল খাওয়ানো।

5. 1 বছর বয়স থেকে শুরু করে 6 মাস অন্তর 3 বছর বয়স পর্যন্ত প্রতিবার 2 লক্ষ ইউনিট ভিটামিন A তেল খাওয়ানো।

6. ভিটামিন A এর ঘাটতিতে আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসার জন্য প্রথমে 2 লক্ষ ইউনিট এবং এরপর 4 সপ্তাহ পর 2 লক্ষ ইউনিট ভিটামিন A সমৃদ্ধ তেল খাওয়ানো।

7. ভিটামিন A আমাদের যকৃতে জমা থাকে। প্রয়োজন হলে যকৃৎ থেকে ভিটামিন A ব্যবহৃত হয়।

রূপায়ণঃ- এই প্রকল্পটি প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের মাধ্যমে রূপায়িত করা হয়। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মহিলা কর্মীরা ও ওঙ্গনওয়াড়ী কর্মীরা ভিটামিন A যুক্ত তেল খাওয়ানোর কাজে যুক্ত থাকেন।

অপুষ্টিজনিত থাইরয়েড প্রতিরোধক কর্মসূচী (National Iodine Deficiency Disorder Control Programme: NIDDCP):

আয়োডিন আমাদের থাইরয়েড গ্রন্থিতে থাইরক্সিন সংশ্লেষণ নিয়ন্ত্রণ করে এবং আয়োডিনের ঘাটতিতে থাইরয়েড গ্রন্থির আকার ও আকৃতি বৃহৎ হয় এবং এই অবস্থাকে গলগন্ড বলে। থাইরক্সিনের ঘাটতিতে শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যহত হয় ও জড়বুদ্ধি সম্পন্ন বামন ও অপরিণত স্নায়বিক বিকাশ হয়ে থাকে।

গলগন্ডের এই কুপ্রভাব দূর করার জন্য ভারত সরকার 1962 খ্রীষ্টাব্দে জাতীয় গলগন্ড নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচী (National Goitre Control Programme: NGCP) প্রবর্তন করেন। যেহেতু খাদ্যের মাধ্যমে আয়োডিন সরবরাহ করে এই গলগন্ড দূর করা যায় সেজন্য জাতীয় সরকার 1992 খ্রী. গলগন্ড নিয়ন্ত্রণের জন্য কর্মসূচির নামকরণ করেন আয়োডিনের অভাবজনিত বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচী (IDDCP)।

কর্মসূচীর উদ্দেশ্য: এই কর্মসূচির প্রধান উদ্দেশগুলি হল-

1. সমীক্ষা দ্বারা গলগন্ড প্রবণ অঞ্চলগুলি চিহ্নিত করা।

2. আক্রান্ত অঞ্চলগুলিতে পানীয় জলে আয়োডিনের মাত্রা নির্ধারণ।

3. খাদ্যলবণকে আয়োডাইজড করে দৈনিক গৃহীত 10 গ্রাম খাদ্যলবণের সঙ্গে 150 মাইক্রোগ্রাম পটাশিয়াম আয়োডাইড মিশ্রিত করে গলগন্ড প্রতিরোধ করা।

4. বাজারে শুধুমাত্র আয়োডাইজড লবণই বিক্রি হয় তা সুনিশ্চিত করা।

5. নির্দিষ্ট সময় অন্তর গলগন্ড নিয়ন্ত্রন সম্পর্কে মূল্যায়ণ করা।

উপভোক্তা: – এই প্রকল্পের উপভোক্তা হল সমগ্র জনসাধারণ। তবে গলগন্ড প্রবণ এলাকার মানুষকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

কাজকর্মঃ- এই প্রকল্পের অধীনে নিম্নলিখিত কাজ করা হয়

a. জনসাধারণের মধ্যে সাধারণ লবণের পরিবর্তে আয়োডিন যুক্ত লবণ (প্রতি 10 গ্রাম খাদ্যলবণে 150 মাইক্রোগ্রাম পটাশিয়াম আয়োডাইড) সরবরাহ সুনিশ্চিত করা।

b. আয়োডিনযুক্ত লবণ নয় এরূপ লবণের উৎপাদন ও ব্যবহার বন্ধ করা।

c. জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।

সামাজিক পুষ্টি প্রকল্প (Community Nutrition Programme):

আমাদের সমাজের বেশকিছু মানুষ আজও অপুষ্টির শিকার। সমাজের দুর্বল শ্রেণীভুক্ত মানুষের অপুষ্টি দূরীকরণে এবং নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদানের অভাবজনিত রোগ প্রতিরোধে ভারত সরকার বিভিন্ন মন্ত্রনালয়ের অধীনে একাধিক পুষ্টি প্রকল্প গ্রহণ করেছেন।

এই সমস্ত পুষ্টি প্রকল্পগুলিকে সামগ্রিকভাবে সামাজিক পুষ্টি প্রকল্প বা Community Nutrition Programme বলা হয়ে থাকে। এই পুষ্টি প্রকল্পের মুখ্য উদ্দেশ্যগুলি হল-

1. খাদ্য ও তার পুষ্টিমূল্য সম্পর্কে জনগনকে সচেতন করা।

2. সুস্থ সবল স্বাস্থ্য বজায় রাখার উপায় সম্পর্কে জনগনকে শিক্ষিত করে তোলা।

3. শিশুদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির উন্নতিসাধন করা ও পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

4. শিশুরোগ নিয়ন্ত্রন করা ও শিশুমৃত্যুর হার কমিয়ে আনা।

5. শিশুদের উপযুক্ত যত্ন ও পরিচর্যা করার জন্য মায়েদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় শিক্ষাদান করা।

6. দেশের উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য জনগণের দৈহিক ও মানসিক স্বাস্থ্য বিকাশে স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সম্পর্কে জনসাধারণকে সচেতন করা।

খাদ্য বিনিময় তালিকা (Food Exchange List):

দৈনিক পথ্যে একইরকম খাদ্যবস্তু থাকলে এগুলির মধ্যে একঘেয়েমি দেখা যায়। এজন্য যাতে একঘেয়েমি না আসে সেজন্য খাদ্য বিনিময় করা প্রয়োজন। খাদ্যদ্রব্য বিভিন্ন ভাবে বিনিময় করা যায়। NIN দ্বারা নির্দেশিত খাদ্য বিনিময় তালিকা গ্রহণ করা সর্বাপেক্ষা ভালো।

ব্যক্তির দৈনন্দিন পথ্য নির্বাচন বা নির্ধারণের জন্য দৈনিক RDA অনুযায়ী শক্তি, প্রোটিন, শর্করা, ফ্যাট, ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ অপরিবর্তিত রেখে একই খাদ্যশ্রেণীর বিভিন্ন খাদ্যবস্তুর মধ্যে যে বিনিময় দ্বারা পথ্যে মেনুর একঘেঁয়েমি দূর করা যায় এবং ব্যক্তির পছন্দের খাবারের অগ্রাধিকার দিয়ে খাদ্য তালিকা প্রস্তুত করা হয় তাকে খাদ্য বিনিময় তালিকা (Food Exchange List) বলে ।

খাদ্য বিনিময় তালিকার প্রয়োজনীয়তা (Necessity of Food Exchanghe List):

খাদ্য বিনিময় তালিকার প্রয়োজনীয়তাগুলি হল নিম্নরূপ:

(i) খাদ্য বিনিময় তালিকা প্রয়োগ করে দৈনিক পথ্যে মেনুর নির্বাচন, ব্যক্তির পছন্দ, অপছন্দের উপর গুরুত্ব দেওয়া।

(ii) পথ্যের মেনু নির্বাচনে ধর্মীয় আচার, রীতি, সংস্কার ইত্যাদি অনুযায়ী সম্পন্ন করে খাদ্য বিনিময় তালিকা প্রস্তুত করা।

(iii) আর্থিক সঙ্গতি অনুযায়ী পথ্য তৈরী করতে খাদ্য বিনিময় তালিকা ব্যবহৃত হয়।

(iv) কোন ব্যক্তির কোন নির্দিষ্ট খাদ্য দ্রব্যে অ্যালার্জি ও অসহিষ্ণুতা থাকলে খাদ্য বিনিময় তালিকা দ্বারা দূর করা সম্ভব।

(v) দৈনন্দিন পথ্যের একঘেঁয়েমি দূর করতে এবং পথ্যের বৈচিত্র আনতে এই খাদ্য বিনিময় তালিকা প্রয়োজন।

(vi) বিভিন্ন রোগগ্রস্থ অবস্থায় রোগীর পথ্য নির্বাচনে এই খাদ্য বিনিময় তালিকা প্রয়োজন।

(vii) নিরামিশাষি ব্যক্তির পথ্য তৈরী করতে হলেও খাদ্য বিনিময় তালিকা প্রয়োজন।

(viii) খাদ্য বিনিময় তালিকা দ্বারা আঞ্চলিকভাবে সহজেই প্রাপ্ত খাদ্য বস্তু দিয়ে পথ্য তালিকা প্রস্তুত করা হয়।

(ix) টাটকা ফল ও সবুজ সব্জি খাদ্য বিনিময় তালিকায় রাখা অত্যন্ত জরুরী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here