মার্শাল ওয়ারেন নীরেনবার্গ জীবনী – Marshall Warren Nirenberg Biography in Bengali

মার্শাল ওয়ারেন নীরেনবার্গ জীবনী – Marshall Warren Nirenberg Biography in Bengali
মার্শাল ওয়ারেন নীরেনবার্গ জীবনী – Marshall Warren Nirenberg Biography in Bengali

আজ আপনাদের জন্য নিয়ে এসেছি মহান ব্যক্তিদের জীবনী সমগ্র। মহান ব্যক্তি আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা। তাঁদের জীবনের ক্ষুদ্রতম অংশগুলি আমাদের জন্য শিক্ষামূলক হতে পারে। বর্তমানে আমরা এই মহান ব্যক্তিদের ভুলতে বসেছি। যাঁরা যুগ যুগ ধরে তাদের কর্ম ও খ্যাতির মধ্য দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন এবং জ্ঞান, বিজ্ঞান, শিল্প ও সাহিত্যের জগতে এক অনন্য অবদান রেখেছেন এবং তাঁদের শ্রেষ্ঠ গুণাবলী, চরিত্র দ্বারা দেশ ও জাতির গৌরব বৃদ্ধি করেছেন। সেইসব মহান ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম বিজ্ঞানী মার্শাল ওয়ারেন নীরেনবার্গ (Marshall Warren Nirenberg) -এর সমগ্র জীবনী সম্পর্কে এখানে জানব।

মার্শাল ওয়ারেন নীরেনবার্গ জীবনী – Marshall Warren Nirenberg Biography in Bengali

নামমার্শাল ওয়ারেন নীরেনবার্গ
জন্ম১৯২৭ খ্রিঃ ১০ই এপ্রিল
পিতাহ্যারি
মাতামিনার্ভা
জন্মস্থানমার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক
জাতীয়তামার্কিন
পেশাবিজ্ঞানী
মৃত্যু

মার্শাল ওয়ারেন নীরেনবার্গ কে ছিলেন? Who is Marshall Warren Nirenberg?

বংশগতির ধারক ও বাহক হল জিন। বাবা-মায়ের দোষগুণ তাদের সন্তানসন্ততির মধ্যে প্রবাহিত হয় এই জিনেরই মাধ্যমে। বস্তুত প্রাণীর বৈশিষ্ট্যের গোপন কথা ধরা থাকে কোষ আশ্রিত একপ্রকার নিওক্লিক অম্লের মধ্যে। এই নিওক্লিক অম্লই হল জিন। আর তার মধ্যে প্রাণীর বৈশিষ্ট্যের যে গোপন কথা থাকে তারই নাম জেনেটিক কোড।

জীবনের এই গোপন কথা বা জেনেটিক কোডের গঠন হল বহু সংখ্যক রাসায়নিক এককের সংযোগ। এই এককগুলির নাম বিজ্ঞানীরা দিয়েছেন নিউক্লিওটাইড। এই বস্তুটির নির্দিষ্ট সজ্জার মধ্যেই রয়েছে জীবনের বৈশিষ্ট্যের গোপনকথা। তাই নিউক্লিওটাইডকে সঠিকভাবে জানতে পারলেই জিনের যাবতীয় পরিচয় জানা সম্ভব হয়।

পুত্র কেন পিতার মতো দেখতে হলো, কিংবা কন্যা কেন মায়ের মতো পটলচেরা চোখ পেল, এই সঙ্কেত জানার জন্যই বিজ্ঞানের ইতিহাসে তৈরি হয়েছে জেনেটিক কোড। আর যে অবিস্মরণীয় বিজ্ঞান প্রতিভা এই অসম্ভব কাজটি সম্ভব করে বিশ্ব বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এক সুদূরপ্রসারী পথ রচনা করেছেন তাঁর নাম মার্শাল ওয়ারেন নীরেনবার্গ।

মার্শাল ওয়ারেন নীরেনবার্গ এর জন্ম: Marshall Warren Nirenberg’s Birthday

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে ১৯২৭ খ্রিঃ ১০ই এপ্রিল, এক স্বচ্ছল পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন নীরেনবার্গ।

মার্শাল ওয়ারেন নীরেনবার্গ এর পিতামাতা: Marshall Warren Nirenberg’s Parents

তাঁর বাবার নাম হ্যারি এবং মায়ের নাম মিনার্ভা।

মার্শাল ওয়ারেন নীরেনবার্গ এর শিক্ষাজীবন: Marshall Warren Nirenberg’s Educational Life

বাড়িতেই প্রাথমিক লেখাপড়া শুরু হয় নিরেনবার্গের। পরে তাঁকে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয় স্থানীয় স্কুলে। কিন্তু সেখানে বেশিদিন লেখাপড়া করার সুযোগ হয়নি তাঁর।

১৯৩৯ খ্রিঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা যখন প্রবল হয়ে উঠেছে, সেই সময় নীরেনবার্গের পিতা সপরিবারে চলে আসেন ফ্লোরিডার অর্লান্ডো সহরে। সেই সময়ে নীরেনবার্গের বয়স মাত্র ১২ বছর।

নতুন জায়গায় নতুন স্কুলে পাঠ শুরু হয় তাঁর। পড়াশুনায় গভীর আগ্রহ, মেধাও অসাধারণ। ফলে অল্পদিনেই স্কুলে ছাত্র শিক্ষক সকলেরই প্রিয় হয়ে ওঠেন নীরেনবার্গ।

মার্শাল ওয়ারেন নীরেনবার্গ এর ছেলেবেলা: Marshall Warren Nirenberg’s Childhood

ছেলেবেলা থেকেই তাঁর বিজ্ঞানের প্রতি ছিল সহজাত আকর্ষণ। চারপাশের প্রকৃতি তাঁকে টানে অহরহ। উদ্ভিদ ও প্রাণীর জীবনের বৈচিত্র্য ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে সেই বালক বয়স থেকেই তিনি ভাবতে শুরু করেন।

প্রাণীদের মধ্যে সকলেই একরকম কেন নয়, শারীরিক গঠনে এত বৈচিত্র্য কেন, উদ্ভিদের মধ্যেই বা কেন এত রকমফের – কী তার রহস্য, এমনি নানা প্রশ্ন নিত্য উদয় হয় তাঁর মনে। আর নিজের মনেই সেই প্রশ্নের জবাব খোজেন বালক নীরেনবার্গ। প্রাণী ও উদ্ভিদের জীবনচক্রের প্রতি এই গভীর অনুসন্ধিৎসাই তাঁকে উত্তরকালে জগদ্বিখ্যাত জীববিজ্ঞানীতে রূপান্তরিত করে।

যথাসময়ে স্কুলের শেষ পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়ে কলেজে ভর্তি হন নীরেনবার্গ। কলেজ থেকে বেরিয়ে চলে আসেন গেইনসভিল সহরে। ভর্তি হন ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখান থেকেই প্রাণীবিদ্যায় স্নাতক হন তিনি ১৯৪৮ খ্রিঃ মাত্র একুশ বছর বয়সে।

স্নাতকোত্তর পড়াও শেষ করলেন ফ্লোরিডাতেই। ১৯৫২ খ্রিঃ স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় থিসিসের জন্য তিনি যে বিষয় বেছে নিয়েছিলেন তা হল ক্যাডিশ ফ্লাই নামে এক ধরনের মাছির পরিবেশগত অবস্থা।

মার্শাল ওয়ারেন নীরেনবার্গ এর কর্ম জীবন: Marshall Warren Nirenberg’s Work Life

ওই সামান্য গবেষণার সুযোগেই- বিষয় নির্বাচনের মধ্যেই প্রমাণ হয়েছিল তাঁর বৈজ্ঞানিক প্রতিভার।

প্রাণিবিজ্ঞানের সূত্রধরেই নীরেনবার্গ আকৃষ্ট হয়ে পড়েন নতুন শাখা প্রাণরসায়নের প্রতি। স্থির করেন প্রাণরসায়ন নিয়েই করবেন গবেষণা।

এই উদ্দেশ্যে তিনি চলে আসেন মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখানেই শুরু করেন প্রাণরসায়নের ওপরে গবেষণার কাজ।

১৯৫৭ খ্রিঃ মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগ থেকে পি.এইচ.ডি ডিগ্রি পেলেন নীরেনবার্গ। এই কাজে তাঁর বিষয় ছিল, বিশেষ এক ধরনের টিউমার কী করে কোষে পারমিয়েজ নামে এক জাতীয় জৈব অনুঘটকের সাহায্যে গ্লুকোজ ও অন্যান্য কার্বন চিনি সংবহন করে।

প্রাণরসায়নের এই গবেষণায় নীরেনবার্গের নির্দেশক-তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন ডঃ জেমস হগ। ডঃ হগ তাঁর এই ছাত্রের মধ্যে আবিষ্কার করেছিলেন আগামী দিনের এক সার্থক রসায়ন বিজ্ঞানীকে।

এরপর প্রাণরসায়ন বিজ্ঞানী হিসেবে তিনি ন্যাশনাল ইনসটিটিউট অব হেলথ নামক জগদ্বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানে দুই বছর কাজ করেন।

এই সময় দুই জীববিজ্ঞানী উইট স্টেটেন ও উইলিয়ম জ্যাকোবিও তাঁর সহযোগী হিসাবে ছিলেন।

এই গবেষণার মূল বিষয় ছিল দুরারোগ্য ক্যান্সার রোগ। এই কাজে তিনি আমেরিকার ক্যান্সার সোসাইটির একটি বৃত্তিও পেয়েছিলেন।

মার্শাল ওয়ারেন নীরেনবার্গ এর আবিষ্কার: Discovery by Marshall Warren Nirenberg

নীরেনবার্গের গবেষণার গভীরতা সংস্থার বিজ্ঞানীদের মুগ্ধ করে এবং ১৯৬০ খ্রিঃ তাঁকে সেখানকার মেটাবলিক এনজাইম শাখার গবেষক বিজ্ঞানী হিসাবে নিযুক্ত করা হয়।

সেই সময় ন্যাশনাল ইনসটিটিউট অব হেলথের মেটাবলিক এনজাইম অংশের অধিকর্তা ছিলেন ডঃ গর্ডন টম্পকিন্স। পরবর্তী সময়ে টম্পকিন্স নীরেনবার্গের গবেষণার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন।

আরও পড়ুন: ইভানজেলিস্তা টরিসেলি জীবনী

নিউক্লিক অম্ল ও প্রোটিনের মধ্যে সম্পর্ক নির্ণয়ের উদ্দেশ্যে সেই সময় বিজ্ঞানী মহলে জটিল পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়েছিল। ১৯৫৯ খ্রিঃ নীরেনবার্গ নিউক্লিক অম্ল বিষয়ে গবেষণা আরম্ভ করলেন।

জিনের গঠনের প্রাণরাসায়নিক বিন্যাসের মধ্যেই নিহীত থাকে প্রাণীর যাবতীয় বৈশিষ্ট্যের সঙ্কেত। এই সঙ্কেত কিভাবে কোষীয় জীবনযাত্রায় ব্যবহৃত হয়ে থাকে এবং কিভাবে এই সঙ্কেত কোষের প্রতিটি অংশকে সঞ্চালিত করে এই সব জটিল প্রশ্ন নিয়ে জীববিজ্ঞানীরা হিমসিম খাচ্ছিলেন। তাঁদের গভীর গবেষণার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছিল।

কঠিনতম প্রাণরাসায়নিক এই সমস্যাটির সমাধান করে নীরেনবার্গ অল্পকালের মধ্যেই বিশ্ববিজ্ঞান ক্ষেত্রে আলোড়ন সৃষ্টি করলেন।

তাঁর এই সংক্রান্ত প্রথম গবেষণাপত্রটি প্রকাশ করেন ১৯৫৯ খ্রিঃ আগস্ট মাসে। এই গবেষণার সূত্র ধরেই পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যেই আবিষ্কৃত হল রাইবো নিউক্লিক অম্ল। যা জিনের মধ্যস্থ সংকেত প্রাণরাসায়নিক প্রোটিনে সঞ্চালিত করার মাধ্যম রূপে কাজ করে থাকে।

আরও পড়ুন: ব্লেজ পাস্কাল জীবনী

গোড়া থেকেই এই প্রাণরাসায়নিক গবেষণার কাজে নীরেনবার্গের সঙ্গে যুগ্মভাবে কাজ করছিলেন ডঃ হেনরিক মাথাই। দুই বিজ্ঞানীর একাগ্র চেষ্টায় অনতিবিলম্বেই ল্যাবরেটরির টেস্ট টিউবে নকল আর.এন.এ বা রাইবো নিউক্লিক অম্ল তৈরি সম্ভব হল এবং প্রাণরসায়ন বিজ্ঞানে এর মাধ্যমে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হল।

এরপর নীরেনবার্গ একের পর এক নকল নিউক্লিক অম্ল নিয়ে তেজস্ক্রিয় অ্যামিনো অম্ল ব্যবহার করে জেনেটিক কোড সম্পূর্ণ করলেন। তাঁর এই কাজটি পরে আরও সহজতর করেছিলেন মার্কিন নাগরিক ভারতীয় বিজ্ঞানী ডঃ হরগোবিন্দ খোরানা।

পরে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন আরো এক বিজ্ঞানী, তিনি হলেন জীববিজ্ঞানী ডঃ রবার্ট হোলি।

জেনেটিক কোড তৈরির যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্যই ১৯৫৯ খ্রিঃ নোবেল কমিটি নোবেল পুরস্কারের জন্য নীরেনবার্গের নামের সঙ্গে হরগোবিন্দ খোরানা ও রবার্ট হোলির নামও মনোনীত করেছিলেন।

জগদ্বিখ্যাত নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই জীবরসায়ন বিজ্ঞানী নীরেনবার্গের নাম নতুন যুগের প্রবর্তক রূপে সর্বত্র ঘোষিত হয়।

মাত্র ৩৫ বছর বয়সে ১৯৫৯ খ্রিঃ নীরেনবার্গ ন্যাশনাল ইনসটিটিউট অব হেলথ-এর Biochemical Genetics বা প্রাণরাসায়নিক প্রজননের নতুন শাখায় গবেষকের পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন। এখানেই তিনি যুগান্তকারী আবিষ্কারটি করেছিলেন।

এর পরেই একের পর এক আসতে থাকে সম্মান ও পুরস্কার। হার্ভার্ড, শিকাগো, মিশিগান, ইয়েল এবং উইন্ডসর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি পেলেন সম্মানজনক ডি.এস.সি ডিগ্রি।

মার্শাল ওয়ারেন নীরেনবার্গ এর পুরস্কার ও সম্মান: Marshall Warren Nirenberg’s Awards And Honors

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় অ্যাকাডেমির বিজ্ঞান বিভাগ ১৯৫৯ খ্রিঃ নীরেনবার্গকে ‘আণবিক জীববিজ্ঞান পুরস্কার’ দিয়ে সম্মানিত করে। দু’বছরের মধ্যেই ১৯৫৯ খ্রিঃ জৈব রাসায়নিক অনুঘটকের ওপরে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য তিনি পেলেন পল লুইস পুরস্কার।

বিজ্ঞান বিষয়ক জাতীয় পদক পেলেন ১৯৫৯ খ্রিঃ। পরের বছর পেলেন গবেষণা সংস্থার পুরস্কার। হিল দে ব্রান্ড পুরস্কার পেলেন ওই একই বছরে। ১৯৫৯ খ্রিঃ পেলেন গর্ডনার মেরিট পুরস্কার এবং ফ্রান্সের বিজ্ঞান অ্যাকাডেমির সম্মান। পরের বছর পান ফ্রাঙ্কলিন পদক ও প্রিস্টলি পুরস্কার। ডঃ খোরানার সঙ্গে যৌথ ভাবে পান মার্কিন বিজ্ঞান অ্যাকাডেমির সদস্যপদ ও লাস্কার পুরস্কার। পরবর্তী পুরস্কারই হল নোবেল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here