দেশভাগের ইতিহাস ও বাঙালি জীবন

দেশভাগের ইতিহাস ও বাঙালি জীবন
দেশভাগের ইতিহাস ও বাঙালি জীবন

দেশভাগের ইতিহাস: ভারত বিভাজন আকস্মিক ও নিষ্ঠুরভাবে ইতিহাসে এসে পড়লেও দীর্ঘকাল ধরেই এর প্রস্তুতি চলছিল । হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গাগুলির মধ্যেই এর ভূণ প্রােথিত ছিল । ১৮৮১ সালে এই দাঙ্গার সূচন, তারপর মাঝে মাঝেই তার পুনরাবৃত্তি হয়েছে ।

দেশভাগের ইতিহাস ও বাঙালি জীবন

হিন্দু-মুসলিম বিরােধকে উৎসাহ দিতে ও সেই বিরােধ স্থায়ী করতে ব্রিটিশ প্রশাসন এই সব দাঙ্গার সুযােগ নেয় । এসব অবশ্য বাহ্যিক কারণ । আসল কারণ যতটা না ধর্মীয় তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক । ১৯০৬ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় সারা ভারত মুসলিম লিগের প্রতিষ্ঠা মুসলিমদের রাজনৈতিক তাশা আকাঙ্খা পূরণের একটা সুযোগ করে দেয় । ১৯৩৭ সালে কংগ্রেস ও মুসলিম লিগ ইন প্রাদেশিক মন্ত্রিসভা নিয়ে আলােচনা শুরু করে, তখনই এই দুই সংগঠনের মধ্যে দ্বন্ধ প্রকাশসলে আসে । ১৯৩৭ সালে জওহরলাল নেহরু জিয়াকে লিখলেন – চুড়ান্ত বিশ্লেষণ অনুযায়ী ভারতে আজ মাত্র দুটি শক্তি আছে এটিশ ঔপনিবেশিক এবং ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রতিনিধিত্বকারী কংগ্রেস জিন্না উত্তর দিলেন,

(১) হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে কোনও মিল নেই এবং

(২) ভারতের মুসলিমরা একটি পৃথক জাতি, তাই তাদের জন্য চাই একটি পৃথক রাষ্ট্র । বিভেদ সম্পূর্ণ হল । ভারতের বিভাজনের জন্য কেবল সময়ের অপেক্ষা ।

১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর হিটলারের পােল্যান্ড আক্রমণ দিয়ে যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা এবং ৩ সেপ্টেম্বর ব্রিটেন ভারতকে একটি যুদ্ধরত রাষ্ট্র বলে ঘােষণা করল এবং ব্রিটিশ ভারতীয় প্রশাসনে শুরু হয়ে গেল পুরােদস্তুর যুদ্ধকালীন তৎপরতা ।

ব্রিটেনের নেতৃত্বাধীন মিত্র দেশগুলিকেই কংগ্রেস সমর্থন করল । তবে ভারতকে ‘যুদ্ধরত রাষ্ট্র’ ঘােষণার ব্যাপারে তাদের সঙ্গে কোনরকম আলােচনা না করায় কংগ্রেস অসন্তোষ প্রকাশ করল ।

১৯৪০ সালের মার্চে রামগড়ে কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশন থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা এবং স্বাধীন ভারতের একটি সংবিধান রচনার জন্য গণপরিষদ গঠনের দাবি জানানাে হল । সেই একই মাসে মুসলিম লিগ তার লাহাের অধিবেশনে ভারতে মুসলিমদের জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্রের দাবি জানায় ।

১৯৪২ সালের মার্চ মাসে ব্রিটিশ সরকার স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিকে একটি নতুন সংবিধানের প্রস্তাব দিয়ে ভারতে পাঠালেন । কংগ্রেস ও মুসলিম লিগ উভয়েই প্রস্তাবগুলি বাতিল করে দেয় ।

১৯৪২ সালের আগস্টে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি ব্রিটিশদের প্রতি গান্ধীজির আহ্বান নিয়ে বিচারবিবেচনা করে বিখ্যাত ‘ ভারত ছাড়াে ‘ প্রস্তাব গ্রহণ করে ।

১৯৪৫ সালে ভাইসরয় লর্ড ওয়াভেলের উদ্যোগে সমস্ত সিমলা সম্মেলন (জুন-জুলাই, ১৯৪৫) বার্থ হল । এরই মধ্যে (জুলাই) ব্রিটেনে লেবার পার্টি সরকারে এল । এই সরকার ভারতীয় পরিস্থিতির উপর বিশেষ গুরুত্ব আরােপ করল ।

ব্রিটেনে লেবার পার্টির বিদেশ সচিব লর্ড পেথিক লরেন্স ঘােষণা করলেন, ভারতের স্বাধীনতার বিষয়টি নিয়ে আলাপ আলােচনা করার জন্য একটি পার্লামেন্টারি কমিশন ভারত সফরে যাবে । পরে ক্যাবিনেট মিশন নামে খ্যাত, এই প্রতিনিধিদলে তার সাংবিধানিক পরিকল্পনায় মুসলিমদের নিজস্ব রাষ্ট্রের অধিকার প্রকারান্তরে স্বীকার করে নেয় | মুসলিম লিগ ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাব মেনে নিলেও কংগ্রেস তা প্রত্যাখ্যান করে ।

এর পরই একাধিক দাঙ্গা বাধে । দাঙ্গার সূচনা হয় । ১৯৪৬ সালের ১৬ থেকে ১৮ আগস্ট ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং ‘ দিয়ে । তারপরেই ঘটে পশ্চিম পাঞ্জাবের হত্যালীলা, সেখানে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল । হতাশ হয়ে কংগ্রেস পাঞ্জাবের বিভাজন দাবি করে ।

১৯৪৭ সালের মার্চে ওয়াভেলের জায়গায় লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভাইসরয় হয়ে আসেন । তিনি জোরালােভাবে ভারত বিভাজনের কথা ঘােষণা করেন । বলেন, যে সব প্রদেশে মুসলিমরা গরিষ্ঠ সেগুলি নিয়ে গঠিত হবে আলাদা একটি রাষ্ট্র পাকিস্তান ।

এইভাবে পাঞ্জাবের একটি অংশ (পশ্চিম পাঞ্জাব), বাংলার একটি অংশ (পূর্ববঙ্গ) এবং গােটা সিন্ধ, বালুচিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ নিয়ে গঠিত হল পাকিস্তান | ভারতের তাবশিষ্টাংশ নিয়ে গঠিত হয় আরেকটি রাষ্ট্র । ব্রিটিশ পার্লামেন্ট অনুমােদিত ভারতীয় স্বাধীনতা আইন (জুলাই, ১৯৪৭) ভারত বিভাগকে আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত করল, গঠিত হল দুটি সম্পূর্ণ স্বাধীন রাষ্ট্র- ভারত ও পাকিস্তান ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here