Gobind Khorana Biography In Bengali – হরগোবিন্দ খোরানা জীবনী

Gobind Khorana Biography In Bengali – হরগোবিন্দ খোরানা জীবনী
Gobind Khorana Biography In Bengali – হরগোবিন্দ খোরানা জীবনী

Gobind Khorana Biography In Bengali – হরগোবিন্দ খোরানা জীবনী: আজ আপনাদের জন্য নিয়ে এসেছি মহান ব্যক্তিদের জীবনী সমগ্র। মহান ব্যক্তি আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা। তাঁদের জীবনের ক্ষুদ্রতম অংশগুলি আমাদের জন্য শিক্ষামূলক হতে পারে। বর্তমানে আমরা এই মহান ব্যক্তিদের ভুলতে বসেছি। যাঁরা যুগ যুগ ধরে তাদের কর্ম ও খ্যাতির মধ্য দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন এবং জ্ঞান, বিজ্ঞান, শিল্প ও সাহিত্যের জগতে এক অনন্য অবদান রেখেছেন এবং তাঁদের শ্রেষ্ঠ গুণাবলী, চরিত্র দ্বারা দেশ ও জাতির গৌরব বৃদ্ধি করেছেন। সেইসব মহান ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম হরগোবিন্দ খোরানা (Gobind Khorana) -এর সমগ্র জীবনী সম্পর্কে এখানে জানব।

Gobind Khorana Biography In Bengali – হরগোবিন্দ খোরানা জীবনী

বিশ্ববিজ্ঞানের এক মহৎ বিজ্ঞানীর নাম হরগোবিন্দ খোরানা। বর্তমান পশ্চিম পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত রায়পুর গ্রামে ১৯২২ খ্রিঃ ৯ ই জানুয়ারী হরগোবিন্দের জন্ম ৷ ভারত ভাগের আগে রায়পুর গ্রামটি ছিল ভারতের মধ্যে ৷ নিতান্ত অল্প কিছু মানুষের বসতি নিয়ে ছোট্ট একটি গ্রাম ৷ হরগোবিন্দের বাবা কাজ করতেন ব্রিটিশ নরকারের অধীনে কৃষি আয়করের হিসাব রক্ষকের পদে ৷ সামান্য লেখাপড়া জানতেন।

গোটা গ্রামে তিনিই ছিলেন একমাত্র লেখাপড়া জানা মানুষ ৷ লেখাপড়া বেশিদূর না থাকলেও হরগোবিন্দের বাবা ছিলেন বিদ্যোৎসাহী মানুষ। নিজের পাঁচটি ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার প্রতি তাই তার যথেষ্ট যত্ন ও চেষ্টা ছিল। গল্পচ্ছলেই তিনি নানা বিষয়ের সঙ্গে ছেলেমেয়েদের পরিচিত করিয়ে দিয়েছিলেন।

সাহিত্য, পৃথিবীর নানা দেশের ইতিহাসের সঙ্গে বিজ্ঞানের শিক্ষা হরগোবিন্দ পেয়েছিলেন বাবার কাছ থেকে। রাতে বিছানায় বসে বাবাকে ঘিরে ভাইবোনের!

শুনতেন নানা মনীষীর জীবনকথা, নানা বিজ্ঞানীর আবিষ্কারের রোমাঞ্চকর গল্প। এই সব শুনে শুনেই খোরানা স্বপ্ন দেখতে শিখেছিলেন বড় আবিষ্কারক বিজ্ঞানী হবার।

ছেলেবেলায় হরগোবিন্দকে পড়তে যেতে হতো গ্রাম থেকে অনেক দূরে এক টোলে। স্কুলঘর বলতে কিছুই ছিল না।এক পিপুল গাছের ছায়ায় বসত সেই টোল। পড়াতেন এক পন্ডিতমশাই।

পশ্চিম পাঞ্জাবের একটি শহরের নাম মূলতান। শৈশবে এই শহরের ডি.এ.ভি স্কুলে ভর্তি হন হরগোবিন্দ। তাঁর বিজ্ঞান শিক্ষার আগ্রহ এখানেই পেয়েছিল অনুকূল আবহাওয়া।

পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহ বরাবরই, হাতের সামনে যে বই পান তাই মনোযোগ দিয়ে পড়েন হরগোবিন্দ। সব বিষয়েই জানার উৎসাহ প্রবল। কিন্তু রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের প্রতিই ঝোঁক বেশি। ডি.এ.ভি স্কুলে যেই শিক্ষক মশাই বিজ্ঞান পড়াতেন তাঁর নাম রতনলাল।

বিজ্ঞানের বিষয় সবই যেন তাঁর গিলে খাওয়া। ছাত্রদের এমন সুন্দর করে বোঝান যে বিষয়গুলো ছবির মত তাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। বিজ্ঞানের মূল ভিত যে যুক্তি ও বিচার তাও তিনি ছাত্রদেব খুব ভাল করে বুঝিয়ে দিতেন।

তাঁর পড়াবার গুণে অতি সাধারণ মাপের ছাত্রও বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ বোধ না করে পারত না। এই রতনলাল স্যারের বিজ্ঞানের প্রতিটি ক্লাশই হরগোবিন্দর বিজ্ঞান-জিজ্ঞাসু মনে গভীর রেখাপাত করেছিল।

ভবিষ্যতে বিজ্ঞানের উচ্চশিক্ষা লাভের সঞ্চল্প এই সময়েই তাঁর মনে অঙ্কুরিত হয়। স্কুলের পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে পাশ করে হরগোবিন্দ চলে এলেন লাহোরে। পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন।

রসায়নে অনার্স নিয়ে শুরু হল তার বিজ্ঞানের উচ্চতর পড়াশোনা। অসাধারণ মেধা নিয়ে জন্মেছিলেন হরগোবিন্দ। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল আগ্রহ ও কৌতূহল।

ফলে রসায়নের কঠিন কঠিন বিষয় অতি সহজেই তাঁর কাছে সহজ হয়ে উঠত। জৈবরসায়নে হরগোবিন্দর ওই সময়েই এমন অসাধারণ দখল এসে গিয়েছিল যে বিস্মিত হতেন অধ্যাপকরা।

অনার্স নিয়ে স্নাতক হবার পর এই বিশ্ববিদ্যালয়েই রসায়ন নিয়ে স্নাতকোত্তর ক্লাশ শুরু করলেন। এই সময় থেকেই জীবনের লক্ষ্যটি নির্দিষ্ট হয়ে গিয়েছিল তার।

আবাল্যের সুপ্ত ইচ্ছা একটা পরিষ্কার রূপরেখা লাভ করেছিল। ভবিষ্যতে একজন বড় বিজ্ঞানী হতে হবে তাকে।

নতুন নতুন আবিষ্কারের মাধ্যমে চমক সৃষ্টি করতে হবে সারা বিশ্বে। হরগোবিন্দর রসায়ন প্রীতি ও উচ্চকাঙ্ক্ষা ধরা পড়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বজনশ্রদ্ধেয় প্রখ্যাত অধ্যাপক মোহন সিং -এর চোখে।

ছাত্রের চোখে ভেসে বেড়ানো স্বপ্ন যেন তিনি স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিলেন। এই জ্ঞানময় গবেষণামনস্ক অধ্যাপক পরম স্নেহে কাছে টেনে নিলেন হরগোবিন্দকে বিজ্ঞানের মূল চাবিকাঠি যে তার প্রয়োগক্ষেত্রে একের পর এক পরীক্ষা আর বিশ্লেষণের মুঠোবন্দি তা তিনি ভাল করে বুঝিয়ে দিতে চেষ্টার ত্রুটি করলেন না। ল্যাবরেটরিতে হাতে কলমে পরীক্ষার কাজে লেগে থাকলেই যে বিজ্ঞানের সত্য আপনা থেকে এসে ধরা দেবে এই সত্যটি মন্ত্রের মত হরগোবিন্দর মনে প্রোথিত করে দিয়েছিলেন মোহন সিং।

বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যে কঠিন সিঁড়িগুলো অতিক্রম করে অগ্রসর হতে হয় তার নাম পরীক্ষা। কাজেই পড়ার সঙ্গে পরীক্ষাটি রাখতে হবে পাশাপাশি।

তবে বিজ্ঞানের পাঠ নেওয়া হবে সার্থক, নচেৎ না। এম.এ. ক্লাশে পড়তে পড়তে নতুন উৎসাহে উজ্জীবিত হয়ে ওঠেন হরগোবিন্দ। কঠিন শপথ উচ্চারিত হয় মনে।

উত্তর জীবনে যখন হরগোবিন্দ ডঃ খোরানা হয়েছেন, সেই সময় বহুক্ষেত্রেই তিনি তাঁর স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এই দুই মহৎ শিক্ষকের কথা ভক্তিনস্র কৃতজ্ঞতার সঙ্গে বিবৃত করেছেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটে ১৯৪৫ খ্রিঃ। সেই সময়েই এম.এসসি ডিগ্রি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরুলেন খোরানা। বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন- বিজ্ঞানের উচ্চতর পঠন-পাঠনের সুযোগ পশ্চিমের মত এদেশে কোথায় ? এই সুযোগ তাঁকে নিতেই হবে। দেশাত্মবোধ আঁকড়ে দেশের মাটিতে পড়ে থাকলে স্বপ্ন কোনদিনই যে সফল হবে না, তা উত্তম রূপে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন তিনি।

কিছুদিন ঘোরাঘুরি করে ভারত সরকারের মেধা-বৃত্তির ব্যবস্থা করে ফেললেন। বৃত্তির টাকা ভরসা করেই পাড়ি জমালেন ইংলন্ডে। এখানে এসে লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ে বিখ্যাত রসায়ন অধ্যাপক ডক্টর রোজার জে.এস.বিয়ারের তত্ত্বাবধানে শুরু হল খোরানার ডক্টরেটের কাজ।

তরুণ খোরানার উৎসাহ ও পরিশ্রম লক্ষ্য করে মুগ্ধ হলেন অধ্যাপক বিয়ার। খুশি হলেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রতি তার ঐকান্তিক আগ্রহ লক্ষ্য করে।

অবিলম্বেই এক বিশ্ববিজ্ঞানীর উজ্জ্বল সম্ভাবনা স্পষ্ট হয়ে উঠল তার দৃষ্টিতে। তিনি তার এই বিদেশী ছাত্রটির প্রতি আরও বেশি আকর্ষণ অনুভব করলেন। পশ্চিমের সভ্যতা ও সংস্কৃতি সম্বন্ধে ইতিপূর্বে খোরানার বিশেষ কোন ধারণাই ছিল না। অধ্যাপক বিয়ারের সহৃদয় সাহচর্য ও প্রেরণায় বিদেশের নতুন পরিবেশের দ্বিধা সঙ্কোচ অল্পদিনের মধ্যেই কাটিয়ে সহজ হয়ে উঠবার প্রেরণা পেলেন।

১৯৪৮ খ্রিঃ জৈব রসায়নে ডক্টরেট লাভ করলেন খোরানা। এরপর পোস্ট ডক্টরাল কাজ করলেন সুইজারল্যান্ডের জুরিখের বিখ্যাত বিজ্ঞান গবেষণাকেন্দ্র ইউজেনসিক টেকনিক ইস্কুলে-অধ্যাপক ভলাদিমির প্রেলোগের সহযোগী হিসেবে। এখানে কাজ করবার সময়েই খোরানার বৈজ্ঞানিক প্রতিভা আত্মপ্রকাশ করতে থাকে।

জুরিখ থেকে দেশে ফিরে এলেন ১৯৪৯ খ্রিঃ। ততদিনে দেশভাগের মর্মান্তিক সেই ঘটনা সম্পূর্ণ। প্রিয় জন্মভূমি রায়পুর, কৈশোর যৌবনের লাহোর ও পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় সবই হয়ে গেছে বিদেশ।

বেদনায় মুষড়ে পড়লেন খোরানা। রাতারাতিই যেন আমূল পাল্টে গেল একটা গোটা দেশের ভূগোল। স্বাধীন ভারতের কর্ণধার তখন পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু।

বিধ্বস্ত, খন্ডিত ভারত তার নেতৃত্বে ধীরে ধীরে হাঁটতে শিখছে। কলকারখানা, নানা শিল্পোদ্যোগ গড়ে উঠতে শুরু করেছে নানা দিকে। প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান।

ভারতের বিজ্ঞান গবেষণার ভিত্তি রচনার কাজে নিয়োজিত হয়েছেন ভাবা, রামন, মেঘনাদ সাহা, প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশের মত খ্যাতকীর্তি বিজ্ঞানী। ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিভাগে গবেষণার সুযোগ বেড়ে উঠছে ক্রমাগত। সেই সঙ্গে বিভিন্ন ক্ষেত্রে তরুণ প্রতিভাবানদের কাজের সুযোগ ও চাহিদা বৃদ্ধি হচ্ছে। দেশ গড়ার কাজে জেগে উঠেছে উন্মাদনা।

বিদেশ থেকে বিজ্ঞানের ডক্টরেট নিয়ে ফিরেছেন খোরানা। দেশ গড়ার কাজে তারও তো একটা ভূমিকা আছে। মনের মত একটা চাকরি পেলে তাকেই তিনি তার দেশ সেবার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন।

কিন্তু খোরানা অনেক চেষ্টা করেও একটা চাকরি জোগাড় করতে পারলেন না। তরুণ গবেষক তিনি, প্রথমে গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলিতে ঢুঁ মারলেন। হতাশ হয়ে কিছুদিন ঘুরলেন নানান বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজায়।

যদি সামান্য একটা লেকচারারের চাকরিও জোটানো যায়। কিন্তু কোথাও কোন আশার আলো দেখতে পেলেন না। শেষ ভরসা ছিল দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়। সেখান থেকেও যখন প্রত্যাখ্যান এল, ততদিনে খোরানা বুঝে গেছেন, এই পোড়ার দেশে যোগ্যতার চেয়ে ধরাধরির বাহাদুরিটাই প্রাধান্য পায়।

সদ্য স্বাধীন একটা দেশের গড়ে ওঠার পথে চেতনা ও দায়িত্বের এই অন্তঃসারশূন্যতা দেখে পীড়িত না হয়ে পারলেন না খোরানা। কিন্তু কি করবার আছে তার? নেতৃস্থানীয় রাজনীতিবিদ, বিজ্ঞানী সকলকেই তার মনে হল বাকসর্বস্ব যন্ত্রমাত্র ৷ না আছে এদের স্বদেশ চেতনা, না আছে আন্তরিকতা ও দায়িত্ব – কর্তব্যবোধ।

এই দেশে তাঁর ঠাই হবার নয়। দেশবাসীর কাছ থেকে এমন ব্যবহার খোরানার স্বপ্নের অতীত ছিল। অনেক ঠেকে তাঁকে জীবনের এক নির্মম অভিজ্ঞতা লাভ করতে হল। শেষ পর্যন্ত হতাশ খোরানা দেশ ত্যাগ করে ১৯৪৯ খ্রিঃ ইংলন্ড রওনা হলেন। এখানে কাজের সুযোগের অভাব নেই।

কেমব্রিজেই ফেলোশিপের ব্যবস্থা হয়ে গেল। খোরানা গবেষণা আরম্ভ করলেন ডক্টর কেনার ও অধ্যাপক আলেকজেন্ডার আর টডের সঙ্গে। দুটো বছর ১৯৫০ থেকে ১৯৫২ খ্রিঃ দেখতে দেখতে কেটে গেল।

এই সময়ে তিনি জৈবরসায়নের গবেষণার নিউক্লিওটাইড তৈরির নানা কলা-কৌশল আয়ত্ত করলেন। এই কাজ করতে করতেই প্রাণরসায়ন বা Biochemistry ক্ষেত্রের মহাসম্ভাবনার পথের সন্ধান পেয়ে গেলেন।

প্রাণীদেহের কোষের ক্রিয়াকলাপের মূল নির্দেশক হল জিন। তার মধ্যে রয়েছে একগুচ্ছ অম্লের নির্দিষ্ট বিন্যাস। এই অম্লগুলি হল অ্যাডিনাইলিক অম্ল, গুয়ানাইলিক অম্ল, থাইমিডাইকলিক অম্ল এবং সাইটিডাইলিক অম্ল।

এই অম্লগুলিই হল নিউক্লিও টাইট। এতে আছে বিশেষ ধরনের একটি সোরাজান বা নাইট্রোজেন ঘটিত ক্ষারক, একটি পাঁচ অঙ্গারক বা কার্বন ঘটিত চিনি এবং একটি ফসফরাস ঘটিত অম্ল।

শেষোক্ত অম্লটির কাজ হল নিউক্লিওটাইডগুলিকে সংপৃক্ত রাখা। প্রাণরসায়নের জিনঘটিত জটিলতার দিকে তখনো পর্যন্ত মনোযোগ আকৃষ্ট হয়নি খোরানার। নিউক্লিওটাইড নিয়ে গবেষণা করার সময় জৈব রসায়নই ছিল তাঁর মনোযোগের কেন্দ্র। এবারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করলেন নিউক্লিওটাইড নিয়ে।

ইতিপূর্বে বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছিলেন জিনের অন্তর্গতকোষের ক্রিয়াকলাপ নিয়ন্ত্রণের যে নির্দেশ তা কোষের নানা অংশে পৌঁছবার জন্য জিন সুচারু শৃঙ্খলায় নিজের অনুরূপ জিন গড়ে তোলে।

এই জিনশৃঙ্কলের নাম রেপ্লিকেশান বা অনুকৃতি। এই অনুকৃতি তৈরির পরবর্তী পর্যায়টি হল নিউক্লিওটাইড -এর নিউক্লিক অম্ল তৈরি করা। এর নাম Transcrip tion বা প্রতিলিপিকরণ। এই পর্যায়ে পরবর্তী ধাপ হল ট্রানশ্লেশান।

এই স্তরে দ্বিতীয় পর্যায়ের নিউক্লিক অম্ল তৈরি করে প্রোটিন। প্রোটিনই হল ভাষা যা কোষের নানা স্থানে বাহিত হয় এবং কোষ তার কাজকর্ম করে। নিউক্লিওটাইড নিয়ে কাজ করতে নেমে খোরানা প্রোটিন ও নিউক্লিক অম্লের পারস্পরিক সম্পর্কের প্রতি আগ্রহান্বিত হয়ে পড়েন।

টডের ল্যাবরেটারিতে এভাবেই খোরানার ভবিষ্যৎ জিনগবেষণার ভিত গঠিত হয়। একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল ১৯৫২ খ্রিঃ। ব্রিটিশ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিজ্ঞানী ডক্টর গর্ডন খোরানাকে চাকরির আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি দিলেন।

ততদিনে খোরানা আর একা নেই। বিবাহ করেছেন। তার স্ত্রী এলিজাবেথ সিবলার; একজন সুইস মহিলা। গবেষণার সামান্য টাকায় সংসার চলছিল টালমাটাল অবস্থায়। কাজেই খোরানা ভাগ্যের আশীর্বাদ মনে করেই চাকরিটি গ্রহণ করলেন।

চলে এলেন ভ্যাঙ্কুবার শহরে। সেই সময়ে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারি উদ্যোগে সদ্য সদ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে রিসার্চ কাউন্সিল। গবেষকদের সবরকম সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থাই সেখানে রাখা হয়েছিল।

গোটা ব্যাপারটাই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছিল প্রভাবশালী বিজ্ঞানী ডক্টর গর্ডন শ্রামের তত্ত্বাবধানে। বিজ্ঞানী খোরানার প্রতিভার প্রথম উদ্বোধন ঘটল এই ভ্যাঙ্কুবারের গবেষণা গারেই।

খোরানা এখানে তাঁর গবেষণার সঙ্গী করে নিলেন অপর এক বিজ্ঞানী জ্যাক ক্যাম্পবেলকে। গবেষণা আরম্ভ হল নিউক্লিক অম্ল বা জিন নিয়ে। তার এই গবেষণায় প্রভূত সহায়তা করেছিলেন ডক্টর গর্ডন টেনারও।

সেই সময়ে কলম্বিয়া ছিল কানাডারই এক অংশ। খোরানা ১৯৬০ খ্রিঃ সপরিবারে চলে এলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। সম্পূর্ণ সময়ের জন্য উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের এনজাইম রিসার্চ ইনসটিটিউটের গবেষণায় যোগ দিলেন। এবারে তিনি নাগরিকত্ব গ্রহণ করলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের।

চিন্তাভাবনা করেই তিনি তা করলেন। একজন ভারতীয় হিসেবে ভারতে ফিরে গিয়ে তার করবার মত কিছুই ছিল না। জীবনের সমস্ত সম্ভাবনা রূপায়ণের পূর্ণ সুযোগ তার রয়েছে এখানেই।

এই কারণে ভারতীয় পরিচয়টুকুও তাকে ঘুচিয়ে ফেলতে হল ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার কথা চিন্তা করেই। এবারে খোরানার পরিচয় হল তিনি একজন মার্কিন জীব-গবেষক। বিশ্ববিজ্ঞানের ইতিহাসে তিনি সেভাবেই চিহ্নিত হয়ে আছেন। যাইহোক, একসময়ে মার্কিন মুলুকেই খোরানা নকল জিন তৈরি করে জিন গবেষণার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করলেন।

বিশ্বের বিজ্ঞানী মহলে তার বিজ্ঞান প্রতিভা স্বীকৃত হল। ১৯৬৮ খ্রিঃ খোরানা মার্শাল নীরেনবার্গ ও রবার্ট হোলির সঙ্গে চিকিৎসা বিজ্ঞান ও শারীরবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার লাভ করলেন। সেই সময় খোরানার বয়স ৪৬ বছর। এই সম্মান তিনি অর্জন করলেন স্বদেশভূমি ভারতবর্ষ ত্যাগের মাত্র আঠারো বছরের মধ্যেই।

স্বদেশে চরম অবহেলিত খোরানা বিদেশের মাটিতে লাভ করলেন তাঁর ক্ষেত্রে যোগ্যতমের সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস। ১৯৭০ খ্রিঃ উইসকিনসন ছেড়ে তিনি চলে এলেন ম্যাসাচুসেটস ইনসটিটিউট অব টেকনোলজিতে। এখানে জীববিজ্ঞান ও রসায়ন বিভাগের অ্যালফ্রেড সোলান চেয়ারে অধ্যাপক নিযুক্ত হলেন।

এখানে ছিল অভাবিত আয়োজন। ল্যাবরেটরি সুসজ্জিত ছিল সর্বাধুনিক যন্ত্রপাতিতে। গবেষণার টিমও পাওয়া গেল মনের মত।

চারপাশে রয়েছে প্রতিভাবান ছাত্রদের উৎসাহব্যঞ্জক উপস্থিতি আর ছিল অফুরন্ত আর্থিক অনুদান। দিনে দিনে কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ বদল যেমন ঘটছিল খোরানার জীবনে তেমনি সেই সুযোগকেও পূর্ণমাত্রায় কাজে লাগিয়েছিলেন তিনি।

জীবন শুরু করেছিলেন রসায়ন বিজ্ঞানী রূপে, জৈব রসায়নই ছিল তাঁর প্রধান উপজীব্য। পরিবেশের আনুকূল্যে একদিন তিনি হয়ে উঠেছেন জীববিজ্ঞানী।

আর এই জীববিজ্ঞানের গবেষণাতেই লাভ করেছিলেন নোবেল পুরস্কার। উইসকনসিন ল্যাবরেটরিতে ঈষ্ট কোষের জিনের একটি অংশকেই কেবল তৈরি করতে সমর্থ হয়েছিলেন খোরানা। ম্যাসাচুসেটস -এর ল্যাবরেটরিতে বসে এবারে তিনি ঈষ্ট কোষের সম্পূর্ণ গঠন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হলেন।

কিন্তু চেষ্টা করে বুঝতে পারলেন সম্পূর্ণ জিন তৈরি করা মানুষের চেষ্টায় অসাধ্য। তবু গবেষণা চলতে লাগল নিরবচ্ছিন্ন ভাবে। এল ১৯৭১ খ্রিঃ। আবার দুনিয়াজোড়া আলোড়ন তুললেন খোরানা।

প্রাকৃতিক জিনের অনুরূপ কৃত্রিম জিন তৈরি করে কৃত্রিম জীবন তৈরি সম্ভবপর করে তুললেন। তার এই গবেষণা প্রজননবিদ্যায় এক সম্ভাবনাময় দিক উন্মোচিত করল।

এশ্চেরিশিয়া কোলাই হল বিশেষ এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া। জীব বিজ্ঞানের প্রয়োজনে এই ব্যাকটেরিয়াকে প্রথম গবেষণার কাজে ব্যবহার করেন বিখ্যাত জার্মান জীবাণুবিদ রবার্ট কখ -এর সুযোগ্য ছাত্র এশ্চেরিশ। তাঁর নামানুসারেই জীবাণুটির নামকরণ হয়েছে এশ্চেরিশিয়া (Escherichia)। আর কোলাই বা কোলন হল বৃহদন্ত্রের একটি বৃহৎ অংশ। এশ্চেরিশিয়া কোলাই ব্যাকটেরিয়াটি সাধারণতঃ মানুষ ও জীবজন্তুর অস্ত্রেই পাওয়া যায়।

জীবাণুটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল, অজৈব মাধ্যমে যখন আন্ত্রিক ব্যাকটেরিয়াদের বংশবৃদ্ধির সুযোগ করে দেওয়া হয় তখন সাইট্রেট অম্লকে কেবল এশ্চেরিশিয়াই বিপাক ক্রিয়ায় ব্যবহার করতে পারে না – ব্যবহার করে গ্লুকোেজকে। বিশ শতকের গোড়ার দিক থেকে জীব গবেষকরা জিন সংক্রান্ত পরীক্ষা নিরীক্ষার ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে এশ্চেরিশিয়া কোলাইকে ব্যবহার করে আসছেন।

এছাড়া এই জীবাণুগুলিকে ব্যবহার করে ভাইরাসঘটিত বহু আবিষ্কারও সম্ভব হয়েছে। এশ্চেরিশিয়া কোলাইতে নানা ধরনের নকল জিন ব্যবহার করে নকল জীবনকে তৈরি করাও সম্ভব হয়েছে।

এই কোলন থেকেই জীবনের সামগ্রিক চেহারার একটা নমুনা জীববিজ্ঞানীরা পেয়েছেন। এইসব কারণে জিন গবেষণায় এশ্চেরিযাকোলনকে বিজ্ঞানীরা ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছেন।

খোরানাও এই ব্যাকটেরিয়ার সাহায্যে জিন সংক্রান্ত গবেষণায় অসাধ্যসাধন করেত সমর্থ হয়েছেন। তিনি ম্যাসাচুসেটসের ল্যাবরেটরিতেই রাসায়নিক উপায়ে এশ্চিরিয়ার হুবহু নকল জিন তৈরির কাজে পূর্ণ সাফল্য লাভ করেছেন। এরপর করলেন এক অবিশ্বাস্য কাজ৷

১৯৭৬ খ্রিঃ বাইরে তৈরি করা নকল জিন এশ্চেরিয়া কোলাই -এর আণবিক স্তরে সাফল্যের সঙ্গে গেঁথে দিলেন।

পর্যবেক্ষণে রেখে দেখা গেল নকল জিনটি এশ্চেরিয়ার জীবনযাত্রায় প্রাকৃতিক জিনের মতই স্বাভাবিক ভাবে কাজ করে চলেছে। জৈব রাসায়নিক ক্ষেত্রে খোরানার এই প্রযুক্তিগত বিস্ময়কর সাফল্য শতাব্দীর বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক অধ্যায়ের সূচনা করল।

এটা নিশ্চিত হয়েই গেল যে মানুষই একদিন মানুষ সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে। এবারে খোরানার পথ অনুসরণ করে জীবন সৃষ্টির কাজে উৎসাহিত হয়ে উঠলেন বিজ্ঞানীরা।

নকল জিন তৈরির দুঃসাধ্য কাজটি করতে গিয়ে খোরানাকে দীর্ঘ নয় বছর গভীর গবেষণায় ডুবে থাকতে হয়েছিল। তার সঙ্গে একইভাবে মনীষা ও কঠোর শ্রম নিয়ে ম্যাসাচুসেটস ল্যাবরেটরিতে কাজ করেছেন আরও ২৪ জন জীববিজ্ঞানী৷

গোটা টিমটির নেতৃত্ব দিয়েছেন খোরানা। দীর্ঘ নয় বছরের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের ফলে জীবাণুর একটি জিন তৈরি সম্ভব হয়েছিল।

কিন্তু মানুষের বৃহত্তর জিন তৈরি যে এর চেয়েও হাজারগুণ কঠিন কাজ বিজ্ঞানীরা সে সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন, তা বলাই বাহুল্য।

হয়তো অদূর ভবিষ্যতে বিজ্ঞানীরা এই দুর্লঙ্ঘ্য প্রাচীর অতিক্রম করতে সক্ষম হবেন। যুগান্তকারী গবেষণার স্বীকৃতি হিসাবে বহু পদক পুরস্কার ও সম্মান খোরানা পেয়েছেন। এখনো পেয়ে চলেছেন।

আশি ছুই ছুই বয়সে এখনো তিনি সমান সক্রিয়৷ ম্যাসাচুসেটসের বাড়ি আর ল্যাব এই তার ঠিকানা। বিজ্ঞানের সাধনায় পূর্ণভাবে আত্মনিবেদিত এই বিজ্ঞানীর জীবন।

আরও পড়ুন-

Join Our Telegram Channel

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here