ইভানজেলিস্তা টরিসেলি জীবনী – Evangelista Torricelli Biography in Bengali

ইভানজেলিস্তা টরিসেলি জীবনী – Evangelista Torricelli Biography in Bengali
ইভানজেলিস্তা টরিসেলি জীবনী – Evangelista Torricelli Biography in Bengali

আজ আপনাদের জন্য নিয়ে এসেছি মহান ব্যক্তিদের জীবনী সমগ্র। মহান ব্যক্তি আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা। তাঁদের জীবনের ক্ষুদ্রতম অংশগুলি আমাদের জন্য শিক্ষামূলক হতে পারে। বর্তমানে আমরা এই মহান ব্যক্তিদের ভুলতে বসেছি। যাঁরা যুগ যুগ ধরে তাদের কর্ম ও খ্যাতির মধ্য দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন এবং জ্ঞান, বিজ্ঞান, শিল্প ও সাহিত্যের জগতে এক অনন্য অবদান রেখেছেন এবং তাঁদের শ্রেষ্ঠ গুণাবলী, চরিত্র দ্বারা দেশ ও জাতির গৌরব বৃদ্ধি করেছেন। সেইসব মহান ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম পদার্থবিদ এবং গণিতবিদ ইভানজেলিস্তা টরিসেলি (Evangelista Torricelli) -এর সমগ্র জীবনী সম্পর্কে এখানে জানব।

Evangelista Torricelli Biography in Bengali – ইভানজেলিস্তা টরিসেলি জীবনী


নাম
ইভানজেলিস্তা টরিসেলি
জন্ম15 অক্টোবর 1608
পিতাGaspare Torricelli
মাতাCaterina Angetti
জন্মস্থানরোম, পোপ রাজ্য
জাতীয়তাইতালীয়
পেশাপদার্থবিদ এবং গণিতবিদ
মৃত্যু25 অক্টোবর 1647 (39 বছর বয়সী)

ইভানজেলিস্তা টরিসেলি কে ছিলেন? Who is Evangelista Torricelli?

বিজ্ঞানের জগতে গ্যালিলিও -এর আবির্ভাব এক মহাবৈপ্লবিক ঘটনা৷ চার্চ অনুশাসিত ও সনাতনপন্থী ধ্যানধারণার কুসংস্কারাচ্ছন্ন যুগে এক বিধ্বংসী ভূমিকম্পের মত তার মতবাদ সমাজের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল।

কেবল বিজ্ঞানের গবেষণা নিয়েই নিমগ্ন ছিলেন না গ্যালিলিও। অধ্যাপনার ক্ষেত্রেও তিনি নিজের বৈপ্লবিক চিন্তাভাবনা মুক্তকণ্ঠে প্রকাশ করে সত্যকে স্বীকার করবার অদম্য মনোবল ছাত্রদের মধ্যেও সঞ্চারিত করতে পেরেছিলেন।

উত্তরকালে তার হাতে গড়া ছাত্রদের মধ্যে অনেকেই বিশ্ববিজ্ঞানের ক্ষেত্রে স্মরণীয় অবদান রেখে কীর্তিমান হয়েছেন। ইভানজেলিসতা টরিসেলি তাঁদের মধ্যে একজন।

ইভানজেলিস্তা টরিসেলি এর জন্ম: Evangelista Torricelli’s Birthday

উত্তর ইতালিব কায়েঞ্জা শহরে ১৬০৮ খ্রিঃ ১৫ ই অক্টোবর টরিসেলির জন্ম। অল্পবয়েসেই শিক্ষালাভের জন্য একটি জেসুইট স্কুলে ভর্তি হন তিনি। খ্রিষ্টান যাজকদের বিশেষ সদস্যরা সেই সময়ে জেসুইট নামে পরিচিত হতেন। তাঁদের প্রতিষ্ঠিত ধর্মশিক্ষার স্কুলগুলিকেই বলা হত জেসুইট স্কুল। কায়েঞ্জা শহরে তখন যত্রতত্র জেসুইটদের স্কুল।

আরও পড়ুন: উইলিয়াম হার্ভে জীবনী

অসাধারণ মেধা নিয়ে জন্মেছিলেন টরিসেলি। যা একবার শুনতেন তা সহজে ভুলতেন না। যা পড়তেন তা মনে গেঁথে যেতো।

ইভানজেলিস্তা টরিসেলি এর পিতামাতা ও জন্মস্থান: Evangelista Torricelli’s Parents And Birth Place

স্কুলে ধর্মশিক্ষার সঙ্গে বিজ্ঞান শিক্ষারও ব্যবস্থা ছিল। বিজ্ঞানের প্রতি তার গভীর আকর্ষণ বাল্যবয়সেই প্রকাশ পেয়েছিল। স্কুলের পড়া শেষ করে রোমে এলেন উচ্চ শিক্ষালাভের জন্য। ভর্তি হলেন বিখ্যাত কলেজিও দ্য সাপিয়েঞ্চা মহাবিদ্যালয়ে।

এখানেই ছাত্রাবস্থায় টরিসেলির হাতে পড়ল একদিন গ্যালিলিওর মহাকর্ষ তত্ত্বের বই।

মহাবিজ্ঞানীর বলবিদ্যা সম্পর্কিত নতুন নতুন চিন্তাধারার পরিচয় লাভ করে চমৎকৃত হলেন। নতুন করে পদার্থবিদ্যার প্রতি আকৃষ্ট হল টরিসেলির মন। কলেজের ক্লাশ মাথায় উঠল এরপর। রোমের লাইব্রেরিগুলিতে হানা দিতে লাগলেন গ্যালিলিওর বই -এর সন্ধানে।

পৃথিবীর সূর্যকেন্দ্রিক আবর্তন প্রকাশের পর শাস্ত্রবিরোধী প্রচারের অভিযোগে চার্চ গ্যালিলিওকে দণ্ডিত করেছিল। নিষিদ্ধ হয়েছিল তাঁর বই।

ইভানজেলিস্তা টরিসেলি এর শিক্ষাজীবন: Evangelista Torricelli’s Educational Life

কিন্তু রাজধানী শহর রোমে গ্রন্থাগার ও সংরক্ষণশালার অভাব ছিল না। সেইসব লাইব্রেরী ঘুরে ঘুরে পেয়েও গেলেন গুটিকতক বই ৷ গোগ্রাসে পড়ে গেলেন। কিন্তু অতৃপ্তি যেন আরও বেড়ে গেল।

বুঝতে পারলেন নতুন চিন্তার সূত্র – সন্ধান করতে হলে উপস্থিত হতে হবে এই জ্ঞানসমুদ্রের উপাস্তে।

গ্যালিলিও যেন এক অদৃশ্য আকর্ষণে টানতে লাগলেন টরিসেলিকে।

১৬৪১ খ্রিঃ তিনি চলে এলেন ফ্লোরেন্স শহরে। সেই সময়ে তাঁর বয়স তেত্রিশ বছর। গ্যালিলিওর কাছে এলেন।

কিন্তু বিজ্ঞানের ভূমিতে ভূমিকম্প জাগানো সেই বিদ্রোহী আগ্নেয়গিরি ততদিনে নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। এতটাই যে টরিসেলি বেদনাক্রান্ত না হয়ে পারলেন না। আট বছর আগেই আদালত গ্যালিলিওর দণ্ডবিধান করেছে। নিষিদ্ধ ঘোষণা হয়েছে তার সূর্যকেন্দ্রিক গবেষণা। তিনি হয়েছেন গৃহবন্দী।

টরিসেলি যখন গ্যালিলিওর সঙ্গে দেখা করতে এলেন তখন তিনি দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। উদ্যম হারালেন না টরিসেলি।

সিদ্ধান্ত নিলেন যতদিন সম্ভব এই জ্ঞান মহীরুহের পদপ্রান্তেই তিনি থাকবেন। গ্যালিলিওর ব্যক্তিগত সচিবের কাজ নিলেন টরিসেলি।

ইভানজেলিস্তা টরিসেলি এর কর্ম জীবন: Evangelista Torricelli’s Work Life

এই সূত্রেই কিছুদিন পরে গ্যালিলিওর ব্যক্তিগত অনেক গোপন কাগজপত্র দেখার সুযোগ পেলেন। সেইসব কাগজ ঘাঁটতে ঘাঁটতে একটা অসমাপ্ত গবেষণার চিত্র খুঁজে পেলেন।

একটা চাপদণ্ডের ছবি। চোঙের ভেতরে একটা চাপদণ্ড বা পিস্টন টেনে গ্যালিলিও কৃত্রিমভাবে শূন্যতা সৃষ্টি করবার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সফল হতে পারেননি। মুহূর্তে মনস্থির করে ফেলেন টরিসেলি। এই অসম্পূর্ণ পরীক্ষাটিকে নতুন করে তো দেখা যেতে পারে।

কিন্তু এ বিষয়ে গভীর কিছু যে আলোচনা করবেন গ্যালিলিওর সঙ্গে তার শরীর সেই অবস্থায় আর নেই। দিনদিনই জীবনীশক্তি নিঃশেষ হয়ে আসছে। হলোও তাই। একমাসের মধ্যেই ১৬৪২ খ্রিঃ গ্যালিলিওর মৃত্যু হল।

ফ্লোরেন্সে থাকার প্রয়োজন ফুরিয়েছিল। তবু কিছুদিন থেকে গেলেন টরিসেলি। বিশ্ববিদ্যালয়ে অঙ্কের অধ্যাপক হিসেবে মাস কয়েক কাজ করলেন।

এই সময়ে তাসকানিয়ার ডিউক ফার্দিনান্দের অঙ্কের গৃহশিক্ষকের কাজটাও জুটে গেল। গ্যালিলিওর মৃত্যুর পর প্রায় এক বছর সময় ইতিমধ্যে পার হয়েছে। এই সময়টা কিন্তু নিশ্চেষ্ট বসে থাকেন নি টরিসেলি।

নিজের সমস্ত কাজের মধ্যেও নলের শূন্যতা সৃষ্টির সেই অসমাপ্ত পরীক্ষাটির কাজে একদিনও অবহেলায় নষ্ট করেন নি। বারবারই ব্যর্থ হচ্ছেন।

কিন্তু কি এক অজ্ঞাত প্রাকৃতিক কারণে যে প্রতিবারেই সাফল্য নাগালে এসেও আসছে না তা বুঝতে পারছেন না। অনেক পরীক্ষানিরীক্ষার পর অজানা প্রাকৃতিক বাধাটিকে জয় করতে সমর্থ হলেন শেষ পর্যন্ত।

টরিসেলি দুটো ৩ ফুট ১০ ইঞ্চি লম্বা কাচের নল বানিয়ে আনলেন, তাদের প্রত্যেকটি একমুখ বদ্ধ করা, একমুখ খোলা।

খোলা মুখ দিয়ে নল দুটিতে পারদ ভর্তি করলেন। তারপর আঙুল চেপে নল দুটি উল্টে নিয়ে দুটো পারদভর্তি বাটিতে আলাদাভাবে খাড়া করে রাখলেন।

আরও পড়ুন: গ্যালিলিও গ্যালিলি জীবনী

সঙ্গে সঙ্গেই এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটে। দেখা যায় বাটির পারদের তল থেকে নলের ৩০ ইঞ্চি ওপর পর্যন্ত পারদস্তম্ভ স্থির ভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। দুই নলের পারদেই একই উচ্চতা।

ব্যাপারটা লক্ষ্য করে এবারে তিনি কাচের নলকে সামান্য কাত করে ধরেন। অমনি বাটির কিছু পারদ নলের ভেতরে ঢুকে পড়ে। আর পারদ স্তম্ভের উচ্চতারও পরিবর্তন ঘটে।

টরিসেলি বুঝতে পারলেন, কাচের নলকে যতক্ষণ খাড়া রাখা যাচ্ছে ততক্ষণই নলের পারদের উচ্চতা ৩০ ইঞ্চি বজায় থাকছে।

এই পরীক্ষা থেকে তিনি সিদ্ধান্ত করলেন, নলের পারদের ৩০ ইঞ্চি উচ্চতার ওপরে যে শূন্য অংশ তা বায়ুশূন্য স্থান। নলের ভেতরে বাইরের কোন জিনিস ঢুকবার সুযোগ না পাওয়ার ফলেই ওই শূন্য স্থানটি তৈরি হয়েছে। বায়ুর চাপই নলের পারদকে এই উচ্চতায় ধরে রেখেছে।

আরও পড়ুন: রেনে দেকার্ত জীবনী

তিনি এরপর আরও কিছু পরীক্ষা করে বুঝতে পারলেন, বায়ুর চাপ নির্দিষ্ট বলেই পারদতলের উচ্চতাও সর্বদাই একই থাকে অর্থাৎ ৩০ ইঞ্চি থাকে।

চাপের পরিবর্তন হলেই পারদতলের উচ্চতারও পরিবর্তন ঘটে। স্থূল কথা, এই উচ্চতা দেখেই বায়ুচাপের মোটামুটি একটা ধারণা পাওয়া সম্ভব।

এই সিদ্ধান্তে আসার পর টরিসেলি তার পরীক্ষার বিবরণ দিয়ে বায়ুচাপ নির্ণয় সম্পর্কে বিখ্যাত প্রবন্ধটি রচনা করেন। সময়টা ১৬৪৪ খ্রিঃ। টরিসেলি সেই প্রবন্ধে অনেক চমকপ্রদ ও নতুন কথা বলেন।

তিনি বলেন, আমরা বায়ুর মহাসমুদ্রে ডুবে আছি। এই সমুদ্রের গভীরতা ৫০০ মাইলেরও বেশি।

আর সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা হল, এই গভীর বায়ু সমুদ্রের একেবারে তলদেশে রয়েছি আমরা। এই বায়ুর ওজন জলের ঘনত্বের ৮০০ ভাগের একভাগ মাত্র।

টরিসেলির সিদ্ধান্ত এই যে, কাচের নলের ৩০ ইঞ্চি পারদতলই বিশাল বায়ু সমুদ্রের সূচক। এইভাবে টরিসেলিই প্রথম এই স্থির উচ্চতার পারদতলকে বায়ু চাপের ফল বলে ঘোষণা করেন।

তিনি স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন, নলের পারদতল যে ওজনের বায়ু পারদের বাটির ওপর চাপ দেয় তার সঙ্গে সমানুপাতিক অর্থাৎ চাপ বাড়লে পারদের উচ্চতা বাড়ে, চাপ কমলে উচ্চতা কমে যায় ৷ টরিসেলি জানান, পারদ ছাড়াও বিভিন্ন আপেক্ষিক ঘনত্বের তরল দিয়েও বায়ুর চাপ মাপা যায়।

জল নিয়েও সম্ভব। তবে জলের ক্ষেত্রে জলতল অনেক দীর্ঘ হয়ে দাঁড়াবে ১৩.৬ গুণ বেশি। এই কারণে এই পরীক্ষার জন্য দরকার হবে ৪৬ ফুটের চেয়েও দীর্ঘ নল।

এই পরীক্ষার জন্য গৃহীত তরলের ঘনত্ব যদি কম হয় তবে ওই তরলতল অনেক বেশি উচ্চতায় দাঁড়াবে। সেক্ষেত্রে দীর্ঘ কাচ নলের দরকার হবে। আর তরল যদি বেশি ঘন হয় তবে তরলতল আগের চেয়ে কম উচ্চতায় দাঁড়াবে। তখন দরকার হবে অপেক্ষাকৃত কম লম্বা নল।

ইভানজেলিস্তা টরিসেলি এর আবিষ্কার: Discovery by Evangelista Torricelli

টরিসেলির এই বায়ুচাপের পরীক্ষা তাঁকে বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত করল। তাঁর নামেই বায়ুর চাপ পরিমাপক যন্ত্রের নাম হয়ে ওঠে টরিসেলির নল।

পারদের বায়ুমান যন্ত্র বা ব্যারোমিটার আবিষ্কার করার পর গ্যালিলিওর দুরবীনের সংস্কার সাধন টরিসেলির অন্যতম বিশিষ্ট অবদান।

তাঁর পরীক্ষানিরীক্ষার ফলেই জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা লাভ করেছিলেন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন দূরবীন। আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, টরিসেলিই যে প্রথম অনুবীক্ষণ যন্ত্রের নকশা তৈরি করেছিলেন তা আমরা অনেকেই জানি না।

তিনিই প্রথম অনুধাবন করেছিলেন, অতি সূক্ষ্ম জিনিস খালি চোখে দেখা সম্ভব নয়, তা দেখার জন্য দরকার কোন বিশেষ যন্ত্র।

বিভিন্ন তরল কণিকার গতি নিয়েও টরিসেলি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেছেন। তার গণিততত্ত্ব প্রক্ষিপ্ত বস্তুর গতিপথের প্রকৃতি নির্ণয়ের পথ সহজ করেছে।

টরিসেলি বায়ুমণ্ডল সম্পর্কে যেসব তথ্য দান করেছেন, উত্তরকালে তার ভিত্তিতেই বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে এসেছে অবিশ্বাস্য দ্রুততা।

ইভানজেলিস্তা টরিসেলি এর মৃত্যু: Evangelista Torricelli’s Death

বিজ্ঞানী জীবনের চূড়ান্ত সাফল্য লাভের সময়ে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে এই সম্ভাবনাময় বিজ্ঞান সাধকের জীবনাবসান হয় ১৬৪৭ খ্রিঃ ২৫ শে অক্টোবর।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here