সমাজসেবী – সমাজ সংস্কারক মাদার টেরিজা জীবনী – Biography Of Mother Teresa

রিজা জীবনী - Biography Of Mother Teresa
রিজা জীবনী - Biography Of Mother Teresa

সমাজসেবী – সমাজ সংস্কারক মাদার টেরিজা জীবনী – Biography Of Mother Teresa- আজ আপনাদের জন্য নিয়ে এসেছি মহান ব্যক্তিদের জীবনী সমগ্র। মহান ব্যক্তি আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা। তাঁদের জীবনের ক্ষুদ্রতম অংশগুলি আমাদের জন্য শিক্ষামূলক হতে পারে। বর্তমানে আমরা এই মহান ব্যক্তিদের ভুলতে বসেছি। যাঁরা যুগ যুগ ধরে তাদের কর্ম ও খ্যাতির মধ্য দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন এবং জ্ঞান, বিজ্ঞান, শিল্প ও সাহিত্যের জগতে এক অনন্য অবদান রেখেছেন এবং তাঁদের শ্রেষ্ঠ গুণাবলী, চরিত্র দ্বারা দেশ ও জাতির গৌরব বৃদ্ধি করেছেন। সেইসব মহান ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম সমাজসেবী – সমাজ সংস্কারক মাদার টেরিজা -এর সমগ্র জীবনী সম্পর্কে এখানে জানব।

সমাজসেবী – সমাজ সংস্কারক মাদার টেরিজা জীবনী – Biography Of Mother Teresa

মাদার টেরিজা প্রেম, শান্তি ও আশ্রয়ের প্রতীক একটি নাম। নিপীড়ন, শোষণ ও নিষ্ঠুরতার হাত থেকে মানুষকে মুক্তি দেবার জন যেসকল সাধু মহাত্মা অশেষ কষ্ট ভোগ করেছেন আজীবন অকাতরে প্রাণ পর্যন্ত দিয়েছেন, মাদার টেরিজা তাঁদেরই শেষ উত্তরাধিকারী। আজকের যুগে এমন মানুষ দুর্লভ হয়ে পড়েছে।

তৎকালীন যুগোস্লাভিয়ার দক্ষিণ অঞ্চলের একটি ছোট্ট গ্রাম স্কোপজে (Skopje)। এখানেই এক আলবেনিয় রোমান ক্যাথলিক কৃষক পরিবারে ১৯১০ খ্রিঃ ২৭ শে আগস্ট মাদারের জন্ম।

তার পিতার নাম নিকোলাস বোজাকসহিউ, পেশায় ছিলেন মুদি। তিনি মেয়ের নামকরণ করেছিলেন অ্যাগনেস গোনক্সহা বোেজাকসহিউ (Agnes Gonxha Bojaxhiu)।

আলবেনিয়ার এই দরিদ্র দম্পতি কোনও দিন ভাবতে পারেননি তাঁদের অতি শান্ত কন্যাটি একদিন পৃথিবীর যাবতীয় দুঃখ মোচনের স্বপ্নকে রূপ দেবার জন্য নিজের জীবনকেই উৎসর্গ করবেন।

সমাজসেবী – সমাজ সংস্কারক মাদার টেরিজা জীবনী – Biography Of Mother Teresa

ছোট্ট মেয়েটি করুণাময় যিশু আর মাতা মেরির ছবির সামনে চোখবন্ধ করে নতমস্তকে দাঁড়িয়ে যে শক্তির প্রার্থনা করতেন তা ছিল তাঁদের অজানা। ঈশ্বরের কাছে এই নীরব প্রার্থনাই ছিল মাদারের যাবতীয় শক্তির উৎস।

পরবর্তী জীবনেও যতই কাজ থাক প্রার্থনার সময়টি তিনি প্রায় সামরিক নিয়মের কঠোরতায় রক্ষা করেছেন।

অ্যাগনেসরা ছিলেন দুই বোন ও এক ভাই। তার একটা পা ছিল কৃশ। শারীরিক এই বিকৃতির জন্য একটা লজ্জার আবরণ তাঁকে ঘিরে থাকতো সব সময়।

সাত বছর বয়সে অ্যাগনেস পিতৃহীন হন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত যুগোস্লাভিয়ায় তাঁর মা অনেক কষ্টে লালন পালন করেন সম্ভান কটিকে।

সমাজসেবী – সমাজ সংস্কারক মাদার টেরিজা জীবনী – Biography Of Mother Teresa

মায়ের প্রেরণাতেই দরিদ্রের প্রতি দয়া ও ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি বিশ্বাস লাভ করেছিলেন অ্যাগনেস। অল্প বয়স থেকেই ধর্মীয় কাজকর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন তিনি।

স্কোপজের পাবলিক স্কুলে পড়বার সময়েই সোডালিটি সংঘের মিশনারিদের কাজকর্মের প্রতি অ্যাগনেসের মন আকৃষ্ট হয়।

সঙ্ঘের পত্রপত্রিকাগুলি নিয়মিত পড়তেন তিনি। ওই পত্রিকাতেই ভারতের নানা খবর প্রকাশিত হত। তার নিজের কথায়, “At the age of twelve I first knew I had a vocation to help the poor. I wanted to be a missionary.”

সমাজসেবী – সমাজ সংস্কারক মাদার টেরিজা জীবনী – Biography Of Mother Teresa

স্কোপজে পাবলিক স্কুলের ক্লাশে যুগোস্লাভিয়ার জেসুইটদের চিঠি পড়ে শোনানো হতো। ওই সব চিঠিতে কোলকাতার কথাও বিশেষভাবে থাকতো। সে সব শুনে শুনেই কলকাতার প্রতি একটা আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল অ্যাগনেসের মনে।

খবর নিয়ে জানতে পারলেন আয়ারল্যান্ডের লরেটো সঙ্ঘ ভারতে কাজ করছে। লরেটো সঙ্ঘের প্রধান কার্যালয় ডাবলিনে। যোগাযোগ করলেন তিনি। তারপর মায়ের অনুমতি নিয়ে যোগ দিলেন লরেটো সঙ্ঘে। গেলেন আয়ারল্যান্ডের বাথার্নহামে। তখন তাঁর বয়স মাত্র আঠারো বছর।

সেই বছরেই, ১৯২৮ খ্রিঃ অ্যাগনেস জাহাজে ভেসে চলে এলেন কলকাতায়। যোগ দিলেন আইরিশ সন্ন্যাসিনীদের প্রতিষ্ঠান সিস্টারস অব লোরেটোতে।

সেই প্রথম বাংলার মাটি চরণ ছুঁয়ে তাঁকে বরণ করে নিল। সেই শুরুর দিন থেকেই অ্যাগনেস মনে প্রাণে হয়ে গেলেন বাংলারই মানুষ।

সমাজসেবী – সমাজ সংস্কারক মাদার টেরিজা জীবনী – Biography Of Mother Teresa

তখনো পর্যন্ত তিনি পুরো সন্ন্যাসিনী হননি। শিক্ষানবিশী পর্ব শেষ করার জন্য তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হল দার্জিলিঙে। দুবছরের পাঠক্রম শেষ করে গ্রহণ করলেন সন্ন্যাসিনী ব্রত: সিস্টার অ্যাগনেস হয়ে ফিরে এলেন কলকাতায়। এন্টালি সেন্ট মেরিজ স্কুলের বাংলা বিভাগে শিক্ষায়িত্রী নিযুক্ত হলেন। তাঁর পড়াবার বিষয় ছিল ভূগোল ও ইতিহাস।

কুড়িবছর তিনি ওই স্কুলের শিক্ষয়িত্রী ছিলেন। ১৯৪২ খ্রিঃ হন ওই স্কুলের অধ্যক্ষা। স্কুলে শিক্ষকতার সময়েই নিকটস্থ মতিঝিল বস্তির বাসিন্দাদের দারিদ্র্য, শিশুদের কষ্ট তাঁকে গভীরভাবে বিচলিত করে। সেটা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কাল। মানুষের সৃষ্ট দুর্ভিক্ষে শহর কলকাতার তখন নাভিশ্বাস। দুমুঠো ভাতের আশায়, একবাটি ফ্যানের আশায় দলে দলে গ্রামের মানুষ ভিড় করছে কলকাতায়, অনাহারে কুখাদ্য খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে মারা যাচ্ছে।

সিস্টার অ্যাগনেস এই সময়েই শুরু করলেন তাঁর কাজ। অচিরেই তিনি বুঝতে পারলেন পেছনে বন্ধন রেখে দরিদ্র আর্তের সেবা হয় না। এখনাকার অতি দীন ক্ষুধার্ত মানুষদের পাশে আশা-ভরসার ঝুলি নিয়ে দাঁড়াতে হলে তাঁকে চার দেয়ালের গন্ডির নিশ্চিন্ত জীবন থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

১৯৪৬ খ্রিঃ ১০ ই সেপ্টেম্বর। দার্জিলিং যাওয়ার সময় এক অলৌকিক উপলব্ধি হল তার। তিনি যেন ঈশ্বরের প্রত্যাদেশ শুনতে পেলেন।

এই উপলব্ধির কথা বলতে গিয়ে মাদার নিজেই বলেছেন, “……. a call within a call …….. The message was clear. I was to leave the convent and help the poor, while living among them.”

গরিবের সেবা করতে হলে গরিব হয়ে তাদের মধ্যে থেকেই তা করতে হবে। ঈশ্বরের এই আদেশ লাভের দিনটিকে আমৃত্যু স্মরণ করতেন মাদার। তিনি বলতেন দ্য ডে অব ডিসিশন- অনুপ্রেরণার দিন।

সমাজসেবী – সমাজ সংস্কারক মাদার টেরিজা জীবনী – Biography Of Mother Teresa

সিস্টার অ্যাগনেস থেকে মাদার টেরিজায় রূপান্তরিত হবার সেই ছিল সূত্রপাত। মাদার প্রতিষ্ঠিত মিশনারিজ অব চ্যারিটি এই দিনটিকে অনুপ্রেরণা দিবস হিসেবে পালন করে। সঙ্ঘ মনে করে ১০ সেপ্টেম্বর ১৯৪৬ খ্রিঃ তাঁদের সঙ্ঘের গোড়াপত্তন হয়।

মাদার সুপিরিয়রের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে অ্যাগনেস লোরেটোর কাজ ছেড়ে দিলেন। লোরেটো সন্ন্যাসিনীদের আলখাল্লা ছেড়ে অঙ্গে তুলে নিলেন মোটা নীলপাড় শাড়ি।

সেদিন তাঁর সম্বল বলতে ছিল পাঁচটি টাকা, একটি বাইবেল, ক্রসগাঁথা একটা জপের মালা। আর সঙ্গে ছিল অকল্পনীয় মনোবল আর ঈশ্বরে নির্ভরতা।

পিতৃদত্ত নাম বদলে নিজের নামকরণ করলেন টেরিজা। সিস্টার টেরিজা। ফ্রান্সের সাধ্বী টেরিজা ১৮৯৭ খ্রিঃ মাত্র ২৪ বছর বয়সে মারা গিয়েছিলেন। দরিদ্র এই সন্ন্যাসিনীই হলেন মাদার টেরিজার পথপ্রদর্শক।

পুরোপুরিভাবে কাজে নামবার আগে নিজেকে আর একটু গড়েপিটে নেবার দরকার। পাটনায় গিয়ে দি সোসাইটি অব ক্যাথলিক মেডিক্যাল মিশনারিজ পরিচালিত একটি হাসপাতালে প্রাথমিক টিকিৎসার ট্রেনিং নিলেন।

১৯৪০ খ্রিঃ ফিরে এলেন কলকাতায়। এসে উঠলেন লিটল সিস্টার্স অব দি পুয়োর সঙ্ঘের সন্ন্যাসিনীদের আশ্রয়ে। তারপর সেখান থেকে উঠে এলেন মতিঝিল বাস্তির পাঁচটাকা ভাড়ার একটা ঘরে।

সেই বছরই তিনি ভারতীয় নাগরিকত্ব গ্রহণ করলেন। শুরু হল তাঁর দুর্গত মানবিকতার কল্যাণে কঠোর সংগ্রাম। এখানেই শুরু করলেন প্রথম স্কুল-গাছতলায় গুটিকতক বাচ্চাকে। অ-ক-খ শেখানোর মাধ্যমে।

পড়ানো শেষ করে তিনি যেতেন কর্পোরেশনের মেথরদের মহল্লায়। তাদের সংসারের খোঁজখবর নিতেন। অসুস্থদের সেবাসুশ্রষা করতেন। তারপর বেরুতেন ভিক্ষায় অর্থ আর ওষুধ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে।

সারাদিন বস্তিতে আর পথে কাটিয়ে রাতে শুতে যেতেন লোয়ার সার্কুলার রোডে সেন্ট যোশেফ হোমে। বৃদ্ধাদের এই আশ্রমে তিনি তাদের সেবা করতেন। ১৯৫০ খ্রিঃ মাত্র আটজন সন্নাসিনী সঙ্গে নিয়ে ৬৪ এ, লোয়ার সার্কুলার রোডে জন্ম নিল মিশনারিজ অব চ্যারিটি। এই রাস্তাটির নাম বর্তমানে জগদীশচন্দ্র বোস রোড।

কলাকাতার একটা ছোট্ট বস্তিতে প্রাণের প্রদীপ জ্বলাবার যে ব্রত নিয়ে একদিন মাদার যাত্রা শুরু করেছিলেন, আজ তা বিশাল এক কর্মযজ্ঞে পরিণত হয়েছে। কেবল ভারতে নয় পৃথিবীর দেশে দেশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান। স্কুল, দাতব্য চিকিৎসালয়, অন্নসত্র, শিশুকেন্দ্র, মানসিক প্রতিবন্ধীকেন্দ্র, কুষ্ঠরোগীদের আবাসস্থল, যক্ষ্মা হাসপাতাল, অবাঞ্ছিত শিশু ও মৃত্যু পথযাত্রীদের আশ্রয় আবাস প্রভৃতি অসংখ্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করে চলেছেন সেবিকারা।

পৃথিবীর ৫২ টি দেশ জুড়ে মাদারের সেবাকেন্দ্র ছড়িয়ে। তাঁর মিশনারি অব চ্যারিটির বহু শাখা- কলকাতা শহরেই রয়েছে ৬০ টি কেন্দ্র এবং শতাধিক সেবাকেন্দ্র।

ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে রয়েছে একশটিরও বেশি শাখা। সারা বিশ্বজুড়ে মাদাবের প্রতিপত্তি। তাঁর সন্ন্যাসিনীদের সঙ্গে রয়েছে পুরুষ কর্মীর দল। তাদের বলা হয় ব্রাদার অব মিশনারিজ। একই মননে, একই বিশ্বাসে সন্ন্যাসিনীদের সঙ্গে তারাও সমান ভাবে কাজ করে চলেছেন।

প্রথমে মিশনারিজ অব চ্যারিটি ছিল কলকাতার আর্চ বিশপের অধীন। তারপর থেকে তা ভ্যাটিকানের পোপের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে এসেছে। নিজের প্রতিষ্ঠানের নিয়ম কানুন বেঁধে দিয়েছেন মাদার স্বয়ং।

অন্যান্য রোমান ক্যাথলিক সন্ন্যাসিনীদের মত এই সংগঠনের সদস্যরাও দারিদ্র্য, সততা এবং নিয়মানুবর্তিতার শপথ গ্রহণ করেন। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানের দারিদ্র্যের শপথ অত্যন্ত কঠোরভাবে পালন করা হয়। মাদারের ভাষায়- “to be able to love the poor and know the poor we must be poor ourselves.”

মাদারের যেমন, তেমনি তাঁঁর সন্যাসিনীদেরও সম্বল বলতে গুটি কতক নীলপাড় মোটা শাড়ি, একটি প্রার্থনার বই এবং একটি ক্রুশ। তারা আত্মীয়স্বজনের কোন সাহায্য নেন না, নিজের প্রতিটি কাজ নিজের হাতেই করেন।

এযুগে অবিশ্বাস্য মনে হবে যে মাদার হাউসে কোনও বৈদ্যুতিক পাখা নেই। কেবল আগন্তুক আব অতিথিদের জন্য কয়েকটি আছে।

মতিঝিলের বস্তির শুরুর দিনগুলো থেকে মাদার হেঁটেই চলাফেরা করতেন। ১৯৬৪ খ্রিঃ তার ব্যবহারের জন্য পোপ ষষ্ঠপল ভারতে এলে নিজের সাদা লিঙ্কন কন্টিনেন্টাল লিমুজিন গাড়িটি দান করেছিলেন। মাদার সেই গাড়ি ব্যবহার করেন নি। সেটাকে নিলামে বিক্রি করে কুষ্ঠরোগীদের আবাস নির্মাণ করেছিলেন।

কলকাতাকে কেন্দ্র করেই মায়ের সেবাব্রতের মহাযজ্ঞ শুরু হয়েছিল। কলকাতার বাইরে প্রথম আশ্রম তৈরি হতে মাদারের সময় নিতে হয়েছিল দশ বছর।

রাঁচি থেকে বেশ কিছু মেয়ে যোগ দিয়েছিল মাদারের সঙ্ঘে। তাই তাদেরই তিনি উপহার দিয়েছিলেন কলকাতার বাইরের প্রথম আশ্রমটি- সিস্টার্স অব চ্যারিটি (১৯৬০ খ্রিঃ)।

তারপর তিনি দিল্লীতে তৈরি করলেন শিশুভবন। এই ভবনের দ্বারোদঘাটন করেন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু। সঙ্গে ছিলেন সুইস রাষ্ট্রদূত এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কৃষ্ণ মেনন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here