বিজ্ঞানী আর্যভট্ট এর জীবনী সমগ্র – Biography Of Aryabhata

বিজ্ঞানী আর্যভট্ট -এর জীবনী সমগ্র | The Entire Biography Of Aryabhata
বিজ্ঞানী আর্যভট্ট -এর জীবনী সমগ্র | The Entire Biography Of Aryabhata

বিজ্ঞানী আর্যভট্ট: আজ আপনাদের জন্য নিয়ে এসেছি মহান ব্যক্তিদের জীবনী সমগ্র। মহান ব্যক্তি আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা। তাঁদের জীবনের ক্ষুদ্রতম অংশগুলি আমাদের জন্য শিক্ষামূলক হতে পারে। বর্তমানে আমরা এই মহান ব্যক্তিদের ভুলতে বসেছি। যাঁরা যুগ যুগ ধরে তাদের কর্ম ও খ্যাতির মধ্য দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন এবং জ্ঞান, বিজ্ঞান, শিল্প ও সাহিত্যের জগতে এক অনন্য অবদান রেখেছেন এবং তাঁদের শ্রেষ্ঠ গুণাবলী, চরিত্র দ্বারা দেশ ও জাতির গৌরব বৃদ্ধি করেছেন। সেইসব মহান ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম বিজ্ঞানী আর্যভট্ট -এর সমগ্র জীবনী সম্পর্কে এখানে জানব।

আর্যভট্ট -এর জীবনী সমগ্র

বিজ্ঞানী আর্যভট্ট এর জীবনী সমগ্র - Biography Of Aryabhata
বিজ্ঞানী আর্যভট্ট এর জীবনী সমগ্র – Biography Of Aryabhata

আর্যভট্ট -এর জীবনী সমগ্র: আর্যভট্ট ভারতবর্ষ থেকে প্রথম যে উপগ্রহটি মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল, তার নাম দেওয়া হয়েছিল আর্যভট্ট । এই নামকরণের মাধ্যমে ভারতবাসী এক প্রাচীন ভারতীয় বিজ্ঞানীর কীর্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছিল ।

প্রাচীন হিন্দুসভ্যতার ইতিহাস চর্চা করলে জানা যায় ধর্ম দর্শনের পাশাপাশি বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার চর্চাও সমান বেগে প্রবহমান ছিল ।

মহাকাশের জ্যোতিষ্কদের দিকে মহাবিস্ময়ে তাকিয়ে ভারতীয় মনীষা যেমন আত্ম-জিজ্ঞাসায় উন্মুখ হয়েছে তেমনি বিজ্ঞানের আলোকপাত ঘটিয়ে উদ্ধার করতেও সমর্থ হয়েছে ।

গ্রহতারাদের গতি, নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট স্থানে তাদের অবস্থানের সংবাদ তাঁরা উদ্ধার করেছেন । তাঁদের সংগৃহীত তথ্য থেকেই জন্ম নিয়েছে ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান । কালক্রমে গণিতের সরল ও জটিল পথ অনুসরণ করে ক্রমোন্নতি লাভ করেছে নভঃবিজ্ঞান ।

আরো পড়ুন: চরক -এর জীবনী সমগ্র

বৈদিক সাহিত্যগুলি থেকেই জানা যায় ভারতীয় মনীষা মহাকাশে গ্রহতারার অবস্থান গণনায় সেই সুপ্রাচীন যুগেই কী বিস্ময়কর প্রতিভা ও পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে ।

প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের সাধনার অন্যতম শ্রেষ্ঠ পুরুষ আর্যভট্ট । প্রাচীন শাস্ত্রগুলি খানেই জ্যোতির্বিজ্ঞানের ও গণিতের আলোচনা উত্থাপিত হয়েছে, সেখানেই আর্যভট্টের নাম উচ্চারিত হয়েছে ।

বিভিন্ন ভাষ্য গ্রন্থের মধ্যেও আর্যভট্টকে ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠ পুরুষ রূপে চিহ্নিত করা হয়েছে । তার চলা পথের অনুসরণ করেই ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানকে অগ্রসর হতে হয়েছে ।

আর্যভট্ট -এর ছোটবেলা

আর্যভট্টের ব্যক্তিজীবন বা পরিবার সম্পর্কে প্রায় সমস্ত তথ্যই রয়েছে মহাকালের অবগুন্ঠনে ঢাকা । তার সম্পর্কে খুব কম বিষয়েই জানা সম্ভব হয়েছে ।

এটুকু জানা যায় যে বর্তমান কেরালারই কোনও একস্থানে আর্যভট্টের জন্ম হয়েছিল ।

তাঁর জন্মকাল নিয়ে মতভেদ থাকলেও খ্রিস্টীয় ৪৭৬ সালকেই মোটামুটি ভাবে নির্দিষ্ট করা হয়েছে ।

এই সম্পর্কে তিনি নিজেই একস্থানে উল্লেখ করেছেন, ষটযুগ ও তিন যুগপদ অস্তকালে তার বয়স তেইশ বছর । জ্যোতিষগণনার এই হিসাব ধরেই দেখা যায় ৪৯৯ খ্রিঃ যদি বয়ঃক্রম তেইশ হয় তাহলে জন্মসময় দাঁড়ায় ৪৭৬ খ্রিঃ ।

কিশোর বয়সেই সুদূর কেরালা থেকে বনজঙ্গল পাহাড় ডিঙ্গিয়ে হাঁটাপথে নালন্দায় পড়তে এসেছিলেন আর্যভট্ট । এই ঘটনাই প্রমাণ করে তার জ্ঞান আহরণের আগ্রহের গভীরতা ।

বর্তমান বিহার প্রদেশের রাজধানী পাটনার প্রাচীন নাম ছিল কুসুমপুর । তার অদূরেই জগদ্বিখ্যাত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংসস্তূপ এখনও বর্তমান ।

খ্রিস্টীয় পঞ্চম-ষষ্ঠ শতাব্দীতে এই বিশ্ববিদ্যালয়েই নানা ধর্মশাস্ত্র, দর্শনের সঙ্গে বিজ্ঞানের ব্যবহারিক শিক্ষা দানের ব্যবস্থাও ছিল ।

আরো পড়ুন- লেখক মার্ক টোয়েন -এর জীবনী সমগ্র

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সংলগ্ন খাগোলা গ্রামে অবস্থিত ছিল বিখ্যাত জ্যোতির্বিক্ষণ কেন্দ্র ও গবেষণা ক্ষেত্র ।

আর্যভট্ট নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ছাত্র ও অধ্যাপক মহলে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন ।

প্রতিভা, অধ্যবসায় ও পরিশ্রম বলে তিনি যা সত্য বলে জানতেন, তা প্রকাশ করতে কখনো কুণ্ঠিত হতেন না । কোন সত্যকেই ধর্মের আবরণে চাপা দেবার চেষ্টা করতেন না ।

তৎকালীন ধর্মাশ্রিত সমাজের পরিবেশ-পরিমন্ডলে তরুণ আর্যভট্ট রীতিমত এক বিদ্রোহী ব্যক্তিত্ব লাভ করেন ।

ভারতে তখন গুপ্তযুগ । সাম্রাজ্যের সিংহাসনে আসীন বুদ্ধগুপ্ত । তাঁর কালেও আর্যভট্টের বৈপ্লবিক চিন্তা ভাবনার কথা পৌঁছতে দেরি হয় না । চিরাচরিত ধ্যান ধারণার বহির্ভূত ভাবনা ও প্রচারের জন্য কিন্তু বাধা হলেন না সম্রাট । বরং নতুন প্রতিভাকে সমাদরে উৎসাহিতই করলেন তিনি ।

আরো পড়ুন: মপাসাঁ -এর জীবনী সমগ্র

রাজকীয় ব্যবস্থাতেই আর্যভট্ট তাঁর গবেষণালব্ধ সত্য জনসমক্ষে প্রকাশ্যে ঘোষণার সুযোগ লাভ করেছিলেন । সেই দিনটি ছিল ৪৯৯ খ্রিঃ ২১ শে মার্চ ।

প্রাচীন ব্রাহ্মণ্য মতবাদকে অস্বীকার করে সেদিন আর্যভট্ট তাঁর বৈপ্লবিক সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেছিলেন ।

আর্যভট্ট -এর কর্ম জীবন

বলেছিলেন, পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরছে, পৃথিবীর আকৃতি গোল । গোল পৃথিবী নিজের অক্ষ-পথে আবর্তিত হয় বলেই একই নিয়মে দিন যায় রাত আসে, আবার রাত যায় দিন আসে ।

চাঁদ ও সূর্যকে রাহু গ্রাস করে বলেই গ্রহণ হয়- একথা সম্পুর্ণ মিথ্যা । পুরাণের এসব গাল-গল্পের কোন সত্যতা নেই । সূর্যের গায়ে পৃথিবী ও চন্দ্রের ছায়া পড়ে বলেই গ্রহণের ঘটনাটা ঘটে । আর্যভট্টই প্রথম ঘোষণা করেন, চাঁদের নিজের কোন আলো নেই, পৃথিবী থেকে চাঁদকে আলোকিত দেখায় সূর্যের আলো চাঁদে প্রতিফলিত হয় বলেই । আসলে চাঁদ হল এক চির অন্ধকারের জগৎ ।

বাইবেলের উক্তি হল, পৃথিবীই সমস্ত গ্রহ-নক্ষত্রের কেন্দ্র; তাকে ঘিরেই সবকিছু ঘুরপাক খাচ্ছে, পৃথিবী স্থির ।

মধ্যযুগের ইউরোপে গ্যালিলিও ঘোষণা করেছিলেন পৃথিবী স্থির নয় আর পৃথিবী নিজেই সূর্যের চারদিকে ঘুরপাক খাচ্ছে ।

সেদিন ধর্মবিরুদ্ধ কথা বলে বাইবেলের অবমাননা করায় গ্যালিলিওকে আদালতের দণ্ডভোগ করতে হয়েছিল ।

সেদিন কেউ বিবেচনা করেনি যে প্রাচীন গ্রীক বিজ্ঞানের ভূল সিদ্ধান্তটিই বাইবেলে স্থানলাভ করেছিল । আর বিজ্ঞানের সেই ভুল ধরিয়ে দিয়েছিলেন উত্তরকালের এক বিজ্ঞানী ।

গুপ্তযুগের উদার পরিবেশে কিন্তু ধর্মবিরুদ্ধ শাস্ত্রবিরুদ্ধ কথা ঘোষণা করেও তরুণ বিজ্ঞানী আর্যভট্টকে অবমাননার কবলে পড়তে হয়নি ।

বরং সেদিন মানুষের প্রচলিতধারণাকে নস্যাৎ করে দিয়ে সগর্বে বিজ্ঞানের এক নতুন ধারণার গোড়াপত্তন হয়েছিল ।

পরবর্তীকালে আর্যভট্টের গবেষণা সম্রাট বুদ্ধগুপ্তকে এতই মুগ্ধ করেছিল যে তিনি তাঁকে সেই জগদ্বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বময়কর্তা নিযুক্ত করেছিলেন ।

নালন্দায় আর্যভট্টের এই নিয়োগ সনাতনপন্থীদের সমর্থন না পেলেও সারা ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা ও ধ্যানধারণায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করেছিল ।

ভারতীয় জ্যোর্তিবিজ্ঞান গবেষণার বৈপ্লবিক সিদ্ধান্তের কথা যেদিন ঘোষণা করেন, ৪৯৯ খ্রিঃ সেই স্মরণীয় দিনেই তরুণ বিজ্ঞানী আর্যভট্ট তার বিখ্যাত গ্রন্থ আর্যভাটিয়া বা আর্যসিদ্ধান্ত রচনা শুরু করেন ।

এই গ্রন্থটি সম্পূর্ণ করতে আর্যভট্ট কত বছর ব্যয় করেন, সে সম্পর্কে নিশ্চয় করে কিছু বলা যায় না । তবে পন্ডিতদের ধারণা ষষ্ঠ শতকের প্রথম দশক পর্যন্ত সময়ের মধ্যে তিনি গ্রন্থটি সম্পূর্ণ করেন ।

আর্যভট্টের গ্রন্থের ধারণা ছিল প্রাচীন ভারতের জ্যোতির্ধারণার চিরাচরিত ধারণার ব্যতিক্রম ।

তিনি এখানে প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও গণনাকারদের মতামতকে গ্রহণ করেও নিজস্ব স্বতন্ত্র ধারণার কথা নির্দ্বিধায় ব্যক্ত করেন ।

আর্যসিদ্ধান্ত চার পদ বা অংশে বিভক্ত । প্রথম পদের নাম দশ গীতিকা । এই অংশে শ্লোকের মাধ্যমে তিনি সংস্কৃত বর্ণমালা ধরে গণিতের বড় বড় সংখ্যা প্রকাশের এক নির্দিষ্ট পদ্ধতি দেখিয়াছেন ।

গ্রন্থের দ্বিতীয় পদের নাম গণিত-পদ । এই পদের ৩৩ টি শ্লোকে রয়েছে কেবলই অঙ্ক আর অঙ্কের সূত্রের কথা ।

তৃতীয় কালক্রিয়া- পদের ২৫ টি শ্লোকে রয়েছে সময়ের হিসাব ।

গ্রন্থের চতুর্থ অংশ হল গোলা- পদ । গোলা অর্থ গোলক । ৫০ টি শ্লোকে রয়েছে গোলক- তত্ত্ব ।

নতুন নতুন পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ এই হল আর্যভট্টের জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণার প্রধান বৈশিষ্ট্য । স্বভাবতঃই তাঁর এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রচলিত প্রাচীন সিদ্ধান্তগুলি বাতিল হয়ে গিয়েছিল ।

আর্যভট্টের যুগান্তকারী গবেষণার ফলেই পৃথিবী যে গোলক ও নিজ কক্ষে সদা আবর্তনশীল এবং সূর্যের এই কক্ষীয় আবর্তনের ফলেই দিন ও রাত হয়, এসব সত্য প্রথম জানা গিয়েছিল ।

আরো পড়ুন: প্রেমেন্দ্র মিত্র এর জীবনী সমগ্র

তিনিই আমাদের প্রথম সূর্য ও চন্দ্রের গ্রহণের জ্যোতির্বিজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়ে রাহুগ্রাসের ধারণ্মকে মিথ্যা প্রমাণ করেছিলেন । আর্যভট্টের যুগান্তকারী আবিষ্কার থেকে আমরা জানতে পেরেছি, চাঁদ নিজে আলোকহীন, চাঁদের ওপরে সূর্যের আলোর প্রতিফলনকেই আমরা চাঁদের আলো বলে ভ্রম করি ।

শূন্যস্থ নিরক্ষবৃত্তকে উত্তর-দক্ষিণ মুখে পরিভ্রমণকালে প্রতি বছরে সূর্য প্রতি ছ’মাস অন্তর যে দুই চরম বিন্দু অতিক্রম করে আর্যভট্ট তাদের নাম দিয়েছেন অয়নাস্ত ও হরিপদী বিন্দু ।

আর্যভট্টই প্রথম লক্ষ করেন এই দুই বিন্দুতে দিন রাত সমান । তারিখ হিসাবে সময়টা ২১ শে মার্চ ও ২৩ শে সেপ্টেম্বর ।

অয়নান্ত ও হরিপদী এই দুই বিন্দুতে সূর্যের গতির একটি নির্দিষ্ট দোলনকাল রয়েছে -এই তথ্যও আর্যভট্টই প্রথম আবিষ্কার করেন ।

এপিসাইকেল কথাটি জ্যোতির্বিজ্ঞানে একটি বহুব্যবহৃত শব্দ । এই শব্দের দ্বারা অপেক্ষাকৃত বড় বৃত্তের কেন্দ্রাশ্রিত পরিধিলগ্ন অপেক্ষাকৃত ছোট বৃত্তকে বোঝায় । এককথায় বড় বৃত্তের পরিধির ওপর আবর্তিত হয় যে ছোট বৃত্ত তাকেই বলে এপিসাইকেল ।

গ্রীক জ্যোতির্বিজ্ঞানী টলেমি এপিসাইকেলের দ্বারা গ্রহের অনিশ্চিত গতিবিধিকে ধরবার চেষ্টা করেছিলেন ।

আর্যভট্ট এপিসাইকেল তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করেছেন । তাঁর এই গবেষণা ছিল টলেমির তুলনায় অনেক বেশি বিজ্ঞান- নির্ভর । আর্যভট্টই প্রথম জ্যোতিবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গ্রহগুলির গতি ব্যাখ্যা করেন ।

জ্যোতির্বিজ্ঞানের সঙ্গে গাণিতের বিশেষ করে জ্যামিতির সম্পর্ক অতি ঘনিষ্ঠ । স্বাভাবিকভাবেই গণিতশাস্ত্রও আর্যভট্টের অবদানে পরিপুষ্ট হয়েছে । বীজগণিতকে ভারতীয় গণিতের সঙ্গে সর্বপ্রথম পরিচয় করিয়ে দেন আর্যভট্টই ।

গ্রহদের অবস্থান গণনার প্রয়োজনেই আর্যভট্টের হাতে জ্যামিতির বহু নতুন তত্ত্ব আবিষ্কৃত হয়েছে ।

অনির্ণেয় সমীকরণকে সমাধান করবার জন্য তিনি যে নতুন আংশিক পথ উদ্ভাবন করেন তাই হল বীজগণিতের ax – by = c ।

আর্যভট্টের অন্যতম গাণিতিক আবিষ্কার হল পাই এর মান নির্ণয় । তার নির্ণীত পাই- এর মান হল ৩.১৪১৬ ।

আধুনিক গণিতজ্ঞদের গণনার সঙ্গে আর্যভট্টের গণনার পার্থক্য নেই বললেই চলে ৷ অথচ দেড়হাজার বছর আগেই তিনি তা আবিষ্কার করেছিলেন ।

আর্যভট্টই প্রথম গ্রহণের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন । আলোর সামনে একটা অস্বচ্ছ বস্তুকে এপাশ ওপাশ সরিয়ে ছায়ার আকৃতির পরিমাপ দেখিয়ে তিনি গ্রহণ ব্যাপারটার ব্যাখ্যা করেছিলেন ।

প্রাচীন ভারতের এই বিজ্ঞানী গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রয়োজনে যেসব তত্ত্ব ব্যবহার করেছেন এযুগের মানুষদের কাছে তা বিস্ময়ের ব্যাপার ।

জ্যামিতি, পরিমিতি, বর্গমূল, ঘনমূল, প্রগতি ও সৌরগোলকের নানা তত্ত্বের আলোচনা করেছেন ।

বিশ্বগণিতের ইতিহাসে আর্যভট্টের দান সাইন (sine) কস (cosine) ট্যান (tan বা tangent) এবং কট (cot বা cotangent) ইত্যাদি । এই সাইন গুলোই ত্রিকোণমিতির ভিত্তিস্বরূপ ।

গণিত বিষয়ে আর্যভট্টের বিভিন্ন তত্ত্ব আধুনিক ভারতীয় বিজ্ঞানীদের চিন্তা ও সাধনার ক্ষেত্রে সাদরে গৃহীত হয়েছে ।

বীজগণিতের যে অনির্ণেয় সমীকরণগুলির ব্যাখ্যা আর্যভট্ট করেছিলেন অতি সহজভাবে, ভাবতে অবাক লাগে গ্রীক বীজগণিতের অন্যতম পুরোধাপুরুষ ডায়ো ফান্টাস চতুর্থ শতকে এ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অন্ধকারেই ছিলেন ।

অথচ গ্রীক সম্রাট জুলিয়াসের সময়কালের এই গ্রীক বিজ্ঞানী বীজগণিতের ক্ষেত্রে চমক সৃষ্টি কবে স্মরণীয় হয়ে আছেন ।

ডায়াফান্টাস তার কল্পনাতেই আনতে পারেননি এমনি অনেক অজানা বিষয় আর্যভট্ট বীজগণিতকে দান করেছেন ।

আশ্চর্যের বিষয় এই যে যাঁকে নিয়ে ভারতীয় বিজ্ঞানের এত গর্ব তার কোন রচনাই দেশে খুঁজে পাওয়া যায় নি ।

তাঁঁর কাজের সন্ধান আমরা পেয়েছি বিভিন্ন সময়ের নানা বিজ্ঞানীর আর্যভট্ট সম্পর্কে উদ্ধৃতি থেকে ।

বিখ্যাত পর্যটক আলবেরুনী একাদশ শতকে ভারতে এসেছিলেন । আর্যভট্ট সম্পর্কে তিনি তার ভ্রমণবৃত্তান্তে পরিষ্কার উল্লেখ করেছেন যে আর্যভট্টের একটিও মূল রচনা তিনি খুঁজে পাননি । ব্রহ্মগুপ্তকৃত আর্যভট্টের উদ্ধৃতিগুলো নিয়েই তাকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে ।

বিভিন্ন উদ্ধৃতিগুলি সংগ্রহ করে বিজ্ঞানী কার্ন সর্বপ্রথম আর্যভট্টের প্রথম গ্রন্থ আর্যভাটিয়া প্রকাশ করেছিলেন লেইডেন শহর থেকে ১৮৭৪ খ্রিঃ । এই গ্রন্থের মাধ্যমেই তাঁর গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের চমকপ্রদ আবিষ্কারগুলির কথা বিজ্ঞানীরা জানতে পারেন এবং শ্রদ্ধায় বিস্ময়ে মাথা অবনত করতে বাধ্য হন ।

ভারত থেকে আর্যভট্টের রচনাগুলি অষ্টাদশ শতাব্দীর আগেই আরবদেশে পাচার হয়ে গিয়েছিল ।

আরব জ্ঞানান্বেষীরা আর্যভট্টের অবদানের সন্ধান লাভ করে বিস্মিত হয়েছিলেন । তাঁরাই তাঁর রচনাগুলি স্বদেশে নিয়ে গিয়েছিলেন ।

আব্বাসাইদ খালিফ, অল মনসুর এবং আল মামু প্রভৃতি জ্ঞানপিপাসু আরবীয়দের চেষ্টায় আর্যভট্ট আরবে কেবল পরিচিতই হননি, সে দেশের জনপ্রিয়তম বিজ্ঞানীদের একজন হয়ে উঠেছিলেন । তাঁর সিদ্ধান্তগুলি আরবীয় গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে নতুন যুগের সূচনা করেছিল । আরবীয়গণ আর্যভট্টের নতুন নামকরণ করেছিলেন আরজাভর ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here